
ভারত থেকে অবৈধ পন্থায় বাংলাদেশের দিকে লোকজনকে ঠেলে দেওয়ার বা পুশ ইনের ঘটনায় সীমান্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গত বুধবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সীমান্তের ১০টি পয়েন্ট দিয়ে অন্তত ১৩০ জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা চালান ভারতীয় সীমান্ত বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা।
তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের কঠোর অবস্থানের মুখে বিএসএফের এসব অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের সীমানায় অনুপ্রবেশের এই আকস্মিক ও ব্যাপক অপচেষ্টা দুই দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বাহিনীর ঠেলে পাঠানো এবং আরেক বাহিনীর ঠেকিয়ে দেওয়ার যে চিত্র সীমান্তে ছড়িয়ে পড়ছে তা নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় প্রাথমিক পর্যায়ে থাকতেই দুই দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা করে এ সমস্যা সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও মানবিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে যেভাবে জোরপূর্বক লোকজনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিজিবি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে এবং স্থানীয় জনতাকে সঙ্গে নিয়ে পাহারার ব্যবস্থা জোরদার করেছে। সব মিলিয়ে সীমান্ত এখন এক অদৃশ্য যুদ্ধের ময়দান হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একদিকে বিজিবি ঢাল হয়ে দেশ রক্ষা করছে, আর অন্যদিকে বিএসএফের একের পর এক উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্কে অবিশ্বাসের দেয়াল তুলছে।
বিজিবি যা বলছে : বিজিবি সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় দেশের পশ্চিম, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে পুশ ইনের ঘটনাগুলো ঘটেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে। সেখানে ৫৮ বিজিবির অধীন সামন্তা বিওপি এলাকায় বিএসএফের একটি প্রিজন ভ্যানে করে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হয়। এরপর সীমান্তের গেট খুলে তাদের জোরপূর্বক বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালায় বিএসএফ। এ সময় বিজিবি সদস্যরা এবং স্থানীয় গ্রামবাসী তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুললে বিএসএফ তাদের পুনরায় ভ্যানে তুলে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
অনুরূপভাবে যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত দিয়ে বেশ কিছু নারী ও পুরুষকে পুশ ইনের চেষ্টা চালানো হয়।
জয়পুরহাটের কয়া ও বাসুদেবপুর সীমান্তের বিপরীতে ১০ জনকে জড়ো করে পুশ ইনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয় বিএসএফ। কিন্তু বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল বৃদ্ধির কারণে তারা পিছু হটে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে ২৮ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা করা হলে বিজিবি তাদের শূন্য রেখায় আটকে দেয়।
এ ছাড়া নেত্রকোনার কচুগড়া সীমান্তে ১৫ থেকে ২০ জনকে পুশ ইন করানোর জন্য একত্র করা হয়। এ তথ্য পেয়ে বিজিবি সেখানে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ী সীমান্ত দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে ১২ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের আশরাফপুর ক্যাম্পের সদস্যরা ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী এবং ছয় শিশুকে পুশ ইন করানোর চেষ্টা করেন।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ওই ব্যক্তিদের মধ্যে সাতক্ষীরা, খুলনা, নরসিংদী ও জামালপুরের বাসিন্দা রয়েছে বলে বিএসএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শারিকুল ইসলাম জানান, বিএসএফ কাঁটাতারের গেট খুলে তাদের ঠেলে দিয়েছে। তারা এখন সীমান্তের শূন্য রেখায় রোদ-বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে। মানবিক কারণে স্থানীয়রা তাদের খাবার দিতে চাইলেও আইনি জটিলতায় তা সম্ভব হচ্ছে না।
সীমান্তের এই পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। বিজিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘এই সম্মেলনে পুশ ইনের অপচেষ্টা, নো ম্যানস ল্যান্ডে ভারতের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং সীমান্ত হত্যার বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানানো হবে।’
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ : সীমান্তের বর্তমান এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘ভারত প্রতিবেশী হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ, কিন্তু এ ধরনের একতরফা পুশ ইন চেষ্টা কোনোভাবেই বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের মধ্যে পড়ে না। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় যে মানসিক পরিবর্তন এসেছে, তার একটি প্রভাব এখানে দেখা যাচ্ছে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সীমান্তের এই সংকট দূর করতে দুই দেশের সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করতে হবে। প্রতিবেশী হিসেবে ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শন করা উভয় দেশের জন্যই মঙ্গলজনক।’
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, সীমান্তে উত্তেজনা কোনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনবে না। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে কোনো উসকানিতে পা দেওয়া যাবে না। তবে বিএসএফ যদি নিয়মিতভাবে এভাবে লোক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা প্রয়োজন। মানবিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে, পরিচয় নিশ্চিত না করে কাউকে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া যায় না।’
ভারতের মানবাধিকারকর্মীরাও মনে করেন, পুশ ব্যাক বা পুশ ইন প্রক্রিয়ার কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই ভারতে। এটি সম্পূর্ণই আইনবহির্ভূত কাজ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এই পদ্ধতি চলে আসছে, যেটি আনুষ্ঠানিকভাবে কেউই স্বীকার করে না।
সীমান্ত হত্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর প্রধান কিরীটী রায় বলছিলেন, ‘বিদেশ থেকে কেউ যদি পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া ভারতে আসে, তাহলে পদ্ধতি হলো তাকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। বিদেশি আইনের ১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী মামলা হবে। মামলায় যদি সেই ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার সাজা হবে। সাজার শেষে আদালতের মাধ্যমেই যে ব্যক্তি যে দেশ থেকে এসেছে, সেখানে ফেরত পাঠানো হবে। অন্য কোনোভাবে নয়। এ ছাড়া ভারতের সংবিধান অনুযায়ী ভারতীয়রা যে অধিকার পায়, সেই একই অধিকার ভারতের মাটিতে থাকাকালে বিদেশি নাগরিকরাও পাবে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও মনে করে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে জোরপূর্বক পুশ ইন মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
যদিও গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘সরকার অবৈধ পুশ ইনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বর্ডারে আমাদের বিজিবি অ্যালার্ট আছে। যদি ভারতের তরফ থেকে দাবি করা হয় যে কোনো বাংলাদেশি সেখানে অবৈধভাবে আছে, তবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার পর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা হবে (রিপ্যাট্রিয়েশন)। কিন্তু জোর করে ঠেলে দেওয়া আমরা মেনে নেব না।’
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত থেকে বাংলাদেশে এভাবে লোক পাঠানোর চেষ্টা করার পেছনে গভীর কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে। যদি এরা প্রকৃতপক্ষেই বাংলাদেশি হয়ে থাকে, তবে কেন ভারত সরকার আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়ে, আলোচনার টেবিল বাদ দিয়ে গভীর রাতে বা প্রিজন ভ্যানে করে তাদের পাঠাতে চাইছে সেটি বড় প্রশ্ন।
বিজিবির সঙ্গে সাধারণ মানুষও সীমান্ত পাহারায় : পুশ ইন প্রতিরোধে বিজিবি এখন সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করছে। গত বুধবার পঞ্চগড়ের বিভিন্ন সীমান্তে বিজিবি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে যৌথ টহল দিয়েছে। গ্রামবাসী নিজ উদ্যোগে রাত জেগে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে। বিজিবি বলছে, স্থানীয়দের সচেতনতা এবং সহায়তার ফলে বিএসএফের অনেক চোরাগোপ্তা পুশ ইন চেষ্টা ব্যর্থ করা সম্ভব হচ্ছে।
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানান, বিজিবি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানাচ্ছে যে সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন এবং দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থী যেকোনো পুশ ইন চেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। সীমান্তে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও অপারেশনাল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা এ ঘটনাকে কোনো একটি মহলের দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করা, ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নীতি অবস্থান এবং বাংলাদেশের দুর্বল কূটনীতিকেও দায়ী করছেন। বলা হচ্ছে, বিএসএফ একটি সরকারি বাহিনী, তাদের কাজ বাংলাদেশে কাউকে ঠেলে পাঠানো নয়। যেহেতু তারা বাংলাদেশকে কিছু না জানিয়ে কাজটি করছে, তাতে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



