বেসরকারি স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে নতুন করে আবেদন আহ্বান এবং যাচাই শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় বেলায় তড়িঘড়ি করে একসঙ্গে ১ হাজার ৭১৯টি নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির তোড়জোড় শুরু করেছিল। মাত্র আট দিনে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে যোগ্য বিবেচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ৫ ফেব্রুয়ারি তা অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়। তবে এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি চেয়ে পাঠানো চিঠিতে সাড়া দেয়নি অর্থ বিভাগ। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এমপিওভুক্তি চূড়ান্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এদিকে গত রবিবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বর্তমান সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের আলোকে ইতিমধ্যে প্রাপ্ত আবেদনের পাশাপাশি নতুন করে আবেদন নেওয়া হবে। আগামী অর্থবছরে ২০২৬-২৭-এর বাজেট বরাদ্দ প্রাপ্তির সাপেক্ষে নতুন পুরাতন সব প্রাপ্ত আবেদন পুনরায় পরীক্ষা করে এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী এমপিওকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টাঙ্গাইল-৭ আসনের এমপি আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর এমপিওভুক্তি বিষয়ক প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী আরো বলেন, টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলায় এমপিওবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পাঁচটি। যার মধ্যে চারটি স্কুল ও একটি কলেজ। সরকার কর্তৃক পর্যায়ক্রমে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কুল ও কলেজে জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২৫-এর আলোকে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওকরণের লক্ষ্যে এমপিওপ্রত্যাশী বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল। নির্ধারিত তথ্যের মাধ্যমে ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনে ৩ হাজার ৬১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবেদন দাখিল করে। বর্তমান সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের আলোকে ইতিমধ্যে প্রাপ্ত আবেদনের পাশাপাশি নতুন করে আবেদন নেওয়া হবে। আগামী অর্থবছরে ২০২৬-২৭-এর বাজেট বরাদ্দ প্রাপ্তির সাপেক্ষে নতুন পুরাতন সব প্রাপ্ত আবেদন পুনরায় পরীক্ষা করে এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী এমপিওকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমপি আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীকে আশ্বস্ত করে শিক্ষামন্ত্রী আরো বলেন, আপনার নির্বাচনি এলাকার আসনভুক্ত টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার আবেদনকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ শর্ত পূরণ করলে, এমপিওভুক্তির যোগ্যতা পূরণ করলে আপনিও সুখবর পাবেন।
১৫ বছরে এমপিওভুক্ত হলো কত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: দেশে বর্তমানে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২২ হাজার ১৭৪টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে এমপিওভুক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৮০৭টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসা। এমপিওভুক্ত হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা মাসে বেতনের মূল অংশ ও কিছু ভাতা সরকার থেকে পেয়ে থাকেন। এমপিওভুক্তির এ সিদ্ধান্ত মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে এবং দীর্ঘ মেয়াদের শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এমপিওভুক্ত করা মানে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়া। সে কারণেই এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা পেশায় মনোযোগী হবেন। এতে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখছে এবং দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে এসব প্রতিষ্ঠানগুলো ভূমিকা রাখবে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালার আলোকে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত সময়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন ৫ হাজার ৯৭টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করেছে। নতুন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রতি মাসে বরাদ্দ দেয় সরকার।
১৫ বছরে স্কুল ও কলেজ বৃদ্ধির হার ৩৩ শতাংশ : ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮০ হাজার ৮০৬ জন, বেসরকারি কলেজের ১৭ হাজার ৪৫৮ জন অর্থাত্ সর্বমোট ৯৭ হাজার ৮৬৪ জন শিক্ষক কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এতে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। ২০০৯ সালে ৭৫২টি এবং ২০২৩ সালে ২৫১০টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অধীনে স্কুল-কলেজ এমপিওভুক্তি বৃদ্ধির হার ২৩৪ শতাংশ। ২০০৯ সালে ১২ হাজার ৪৭০টি এবং ২০২৩ সালে ১৫ হাজার ৯৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এতে বৃদ্ধির হার ২১ শতাংশ। তাছাড়া ২০০৯ সালে ৩৮৬টি এবং ২০২৩ সালে ৬১২টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ২০০৯ সালে ৭৬৮টি, ২০২৩ সালে ১১৪৭টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ, ২০০৯ সালে ৯৬৪টি, ২০২৩ সালে ১০৬৯টি ডিগ্রি কলেজ এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। ২০০৯ সালে মোট এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান ছিল ১৫ হাজার ৩৪০টি। আর ২০২৪ সালে মোট এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান ২০ হাজার ৪৩৭টি। স্কুল ও কলেজ বৃদ্ধির হার ৩৩ শতাংশ। এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীন ১ হাজার ৭১০টি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নতুন করে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে।
‘রকেট গতিতে’ আবেদনগ্রহণ ও যাচাই-বাছাই, তালিকায় থাকা অধিকাংশেরই নেই কাম্য শিক্ষার্থী: গত ৫ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠির তথ্যানুযায়ী, গত ১৪ জানুয়ারি থেকে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার লক্ষ্যে অনলাইনে আবেদন নেওয়া শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ আবেদন প্রক্রিয়া চলে গত ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে মোট ৩ হাজার ৬১৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও পেতে অনলাইনে আবেদন করে। আবেদন শেষে শুরু হয় যাচাই-বাছাই। কিন্তু মাত্র আট কর্মদিবসে সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত যাচাই শেষ করে ফেলেছে এমপিও কমিটি। তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, যোগ্য বিবেচিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ৪৭১টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৬২৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৩৫টি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৪৫টি উচ্চমাধ্যমিক কলেজ, স্নাতক পাশ কলেজ ৭৮টি, ২৩২টি স্নাতক (সম্মান) কলেজ এবং স্নাতকোত্তর কলেজ ৩৫টি। এদিকে, ‘রকেট গতিতে’ আবেদনগ্রহণ, যাচাই-বাছাই শেষে এতসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ ওঠে, প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য প্রতিষ্ঠানভেদে ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষক প্রতি ১০ লাখ টাকা করে লেনদেন হয়েছে। ফলে যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বেশি, সে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে ঘুষও বেশি। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেনদেনের পরিমাণ অর্ধকোটি ছাড়িয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। অথচ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই নেই কাম্য শিক্ষার্থী। নামকাওয়াস্তে চলা স্কুল ও কলেজকে এমপিওভুক্তি করতে তালিকা চূড়ান্ত হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এমপিওভুক্তির পথ সহজ করতে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ সংশোধন করা হয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা, ফলাফল ও একাডেমিক স্বীকৃতির মানদণ্ড শিথিল করে অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্য প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যে কারণে বর্তমান সরকার ঐ তালিকা রিভিউ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


