আন্তর্জাতিক ডেস্ক : জুমার নামাজের সময় হয়েছে। কিন্তু কোনো মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার সুযোগ নেই। কয়েক শ মানুষ তাই কঙ্ক্রিটের বানানো পার্কিং লটে গিয়ে আদায় করছেন নামাজ। শক্ত মেঝেতে হাঁটু রেখে দিচ্ছেন সিজদা। যেখানে সিজদা দিচ্ছেন, সেখানটা আরও শক্ত।

 ইতালির যে শহরে গাড়ি পার্কিংয়ের শক্ত মেঝেতে পড়তে হচ্ছে নামাজ

ইতালির উত্তরপূর্বাঞ্চলের শহর মনফালকনে সম্প্রতি দেখা গেছে এমনই চিত্র। এখানেই জুমা কিংবা অন্যান্য ওয়াক্তের নামাজ পড়তে আসেন শহরের মুসলমান বাসিন্দাদের একটি অংশ। কারণ, গত নভেম্বর থেকেই তাঁদের দুটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন মনফালকনের কট্টর ডানপন্থী মেয়র আনা কিসিন্ত। এই নিষেধাজ্ঞার কারণ হিসেবে বলছেন নগর পরিকল্পনায় ‘জোনিং’–এর কথা।

ফলে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র দুটির পরিবর্তে প্রায় ৬ মাস ধরে এই পার্কিং লটেই জামায়াতে নামাজ আদায় করতে হচ্ছে মনফালকনে শহরের মুসলমানদের। তারা অপেক্ষায় আছে আদালতের একটি রায়ের। এই শহরের মুসলমানেরা দাবি করছেন, নামাজ পড়ার সুযোগ বন্ধ করে তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। চলতি মে মাসেই এ নিয়ে আদালত রায় দিতে পারে বলে জানা গেছে। সে রায়ে তারা নিজেদের নামাজের জন্য নির্দিষ্ট জায়গার আদেশ আসার প্রত্যাশা করছেন।

তার আগে জুমার নামাজের জন্য যে জায়গাটি মুসলমানেরা বেছে নিয়েছেন, তার মালিক রেজাউল হক। সবাইকে এই সুবিধা দেওয়া এই ব্যক্তি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এ শহরকে নিজেদের বাড়ির মতোই মনে করেন তাঁরা। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাঁদের হেনস্তা করছে।

২০০৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ইতালির মনফালকনে যান রেজাউল হক। তিনি এখন সেখানকার নাগরিক। রেজাউল হক বলেন, ‘আমরা এখন কোথায় যাব? আমাদের মনফালকনে শহরের বাইরে যেতে হবে কেন? আমি এখানে থাকি, এখানেই কর দিই। ক্যাথলিক, অর্থোডক্স, প্রোটেস্ট্যান্ট, জেহোবাহ—তাদের যদি এখানে গির্জা থাকে, তাহলে আমাদের নেই কেন?’ত্রিয়েস্টের বাইরের ওই এলাকায় যতজন বাসিন্দা রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তিনভাগের একভাগই মুসলমান। সেখানে মোট ৩০ হাজার বাসিন্দা বলে জানা যায়। এখানকার মুসলমানদের বেশির ভাগই বাংলাদেশি। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফিনকান্তিয়েরির হয়ে কাজ করতে আসেন। মনফালকনেতে জাহাজ শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান এটি।

এই এলাকার রাস্তায় বের হলেই বোঝা যায় প্রবাসীদের সংখ্যা। প্রায়ই দেখা যায় সাইকেলে করে কাজে যাচ্ছেন কিংবা কাজ থেকে ফিরছেন প্রবাসীরা। এ ছাড়া রাস্তার পাশে বিভিন্ন মুদির দোকানেও দেখা যায় তাদের।

যার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, সেই মেয়র আনা কিসিন্ত বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞা আসলে কোনো বৈষম্যের কারণে করা হয়নি। এটি করা হয়েছে ‘জোনিং’ নিয়মে। এই জোনিং মানে হচ্ছে এলাকাভিত্তিক প্রার্থনার জায়গা ঠিক করা।

মধ্যপ্রাচ্যভিক্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ বলছে, আধুনিক নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে যেসব ব্যাপার যুক্ত করা হয়, এর মধ্যে উপাসনার জায়গা খুব কমই রাখা হয়ে থাকে। আর একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের মেয়র হিসেবে আনা কিসিন্ত সেই পথেই হাঁটতে চাইছেন। তিনি এর বাইরে গিলে মুসলমানদের নামাজের জায়গার অনুমতি দিতে পারছেন না বলেই জানিয়েছেন।

মেয়র আনা কিসিন্ত বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘মেয়র হিসেবে আমি কারও বিরুদ্ধে নই। আমি কারও বিরুদ্ধে গিয়ে কথা বলে সময়ও নষ্ট করতে চাইছি না। আর আমি এখানে দায়িত্বে আছি আইন প্রয়োগের জন্যই।’

ইতালির উত্তরপূর্বাঞ্চলের এই শহরে ক্রমে মুসলমান অভিবাসী বাড়ছে বলে জানান মেয়র আনা। এর প্রধান কারণ পরিবারের সদস্যদের সেখানে নিয়ে যাওয়া এবং বংশবৃদ্ধি। তিনি বলেন, ‘এদের সংখ্যা এখন অনেক। আপনাকে এভাবেই আসলে বলতে হবে।’

আর এসব কথা গত কয়েক মাস ধরেই বলে যাচ্ছেন মেয়র আনা। মনফালকনের মুসলমান বাসিন্দাদের সামাজিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে এসব মন্তব্যের কারণে সারা ইতালিতেই তিনি এখন বেশ আলোচিত। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের আর বেশিদিন নেই। সেখানে মাতেও সালভিনির অভিবাসী বিরোধী দল লিগের হয়ে তিনি নির্বাচন করার সুযোগ পাবেন বলেই মনে করা হচ্ছে। আর সেই দল আবার প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির জোটের অংশ।

গত কয়েক দশক ধরেই ইতালির উত্তরাঞ্চলে মসজিদ বানানোর ক্ষেত্রে বাধা দিয়ে আসছে এই রাজনৈতিক দল লিগ। এবার মুসলমানদের সেই সংকট ক্যাথলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ ইতালির অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ল।

ইতালির আইন বলছে, দেশটিতে যে ১৩টি ধর্মের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা রয়েছে, তাতে ইসলাম নেই। আর সে কারণেই এখানে মুসলমানদের সংকট বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইতালির মুসলমান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় সংগঠন ইতালিয়ান ইসলামিক রিলিজিয়াস কমিউনিটির (সিওআরইআইএস) একজন ইয়াহিয়া। তিনি বলছেন, বর্তমানে ইতালিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত ১০টির কম মসজিদ রয়েছে। অথচ দেশটিতে ২০ লাখের বেশি মুসলমান থাকে। এ কারণে নামাজের জন্য এমন পার্কিংয়ের জায়গা বেছে নিতে বাধ্য হন তাঁরা। এ ছাড়া অমুসলিমদের হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড তো রয়েছেই।

বিদ্বেষ ছড়াতে শুরু হয়েছে কবেই। গত ডিসেম্বরে অনলাইনে মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয় মেয়র কিসিন্তকে। এরপর থেকে তিনি পুলিশি নিরাপত্তায় চলাচল করেন। তবে, কারা এই হুমকি দিয়েছে, তা সরাসরি বলেননি তিনি।

বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে প্রায়ই কথা বলতে দেখা যায় মেয়রকে। এর মধ্যে মুসলমানের কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে ইতালির ভাষা না শিখিয়ে শুধু আরবি শেখানো, স্ত্রীদের অধীনস্ত করে রাখা ও মেয়েদের পর্দা করে স্কুলে যাওয়া উল্লেখযোগ্য।ভবিষ্যৎ ইউরোপ কী এমনই হবে? 
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে বারবার এসব অভিবাসীদের নিয়ে কথা বলে আসছে মেয়র আনার দল লিগ। বেশির ভাগ সময়ই অবৈধ পথে ইতালিতে আসাদের নিয়ে কথা বলে তারা। দলটি জানায়, গত বছর নৌকায় করে এমন ১ লাখ ৬০ হাজার অবৈধ অভিবাসী এসেছে ইতালিতে। বেশির ভাগই মুসলমান।

রাজনৈতিক দল লিগের প্রধান মাতেও সালভিনি আগামী জুনে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে ‘ইউরোপের ভবিষ্যতের ওপর গণভোট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ওই ভোটেই ঠিক হয়ে যাবে ইউরোপ এখনো টিকে থাকবে, নাকি ইসলামি উপনিবেশ তৈরি হবে।

তবে এ ধরনের বক্তব্যের কোনো যথার্থতা নেই বলে দাবি করছেন উত্তরপূর্বাঞ্চলের শহর মনফালকনের মুসলমানেরা। তাঁরা বলছেন, সবার কাছে কাজের অনুমতি রয়েছে। তাদের কাছে পাসপোর্টও রয়েছে। এ নিয়ে এক মন্তব্যে রেজাউল হক বলেন, ‘আমরা এখানে সুন্দর শহর মনফালকনে দেখতে আসিনি। এখানে কাজ পেয়েছি বলেই থাকছি।’

এখানে হিংসাত্মক কোনো কাজের নমুনা না দেখা গেলেও জীবন নিয়ে আগের চেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন বলে এএফপিকে জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন মুসলমান। এই এলাকায় যারা দীর্ঘদিন ধরে বাস করছেন, তাঁরা এখন আর আগের মতো আচরণ করছেন না।

ফিনকান্তিয়েরি নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ৩৮ বছর বয়সী আহমেদ রাজু। তিনি নামাজ পড়েন ঘরেই। কারণ, মসজিদ নেই কোনো। তবে জুমার নামাজের সময় তিনি সংকটে পড়ে যান। কেননা জুমার নামাজ পড়তে হয় জামায়াতে। তাঁর মনে একটা কথাই বারবার আসে, মেয়র মনে হয় মুসলমানদের দেখতে পারেন না।

আহমেদ রাজু বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনার মনে হবে আপনি একটা বড় দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আর সে দেয়াল আপনি ভাঙতে পারবেন না। আমরা বিদেশি, এই অবস্থা কখনো পরিবর্তন করতে পারব না।’

সম্প্রতি ইতালির এই শহরে এসেছেন ৩২ বছর বয়সী শারমিন ইসলাম। একটি স্কুলের সামনে ছেলেকে নিয়ে আসতে দেখা যায় তাঁকে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে স্কুল থেকে ফিরে জিজ্ঞাসা করে, আম্মা, আমরা মুসলমানেরা কি খারাপ?’

একটি প্রশাসনিক আদালতে এই মসজিদ না থাকা নিয়ে আগামী ২৩ মে শুনানিতে বসবে। এতে যে রায়ই হোক না কেন, বিকল্প কোনো পরিকল্পনা নেই মুসলমান বাসিন্দাদের হাতে। হেরে গেলে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আর জিতে গেলেও এই অচলাবস্থা আরও ঘনীভূত হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

এর মধ্যেই নিজের লেখা বই ‘এনাফ অলরেডি: ইমিগ্রেশন, ইসলামাইজেশন, সাবমিশন’–এর জোর প্রচার শুরু করেছেন ইতালির উত্তরপূর্বাঞ্চলের শহর মনফালকনের মেয়র আনা কিসিন্ত। বইয়ের প্রচারে বিভিন্ন জায়গায় তিনি বলে বেড়াচ্ছেন, মনফালকনের এই পরিস্থিতি অন্যত্রও দেখা যেতে পারে।

এ নিয়ে স্থানীয়রা কী ভাবছেন—সেই চিত্র জানা গেল ২৪ বছর বয়সী গেনারো পোমাতিকো নামের এক ব্যক্তির কথায়। তিনি বলেন, স্থানীয়রা তো তাদের মেনে নেবেন না। তবে, তাঁরা কিন্তু কারও ক্ষতি করছেন না।

ইতালির এই শহরের মতো ইউরোপের বিভিন্ন দেশেই সম্প্রতি মুসলিম অভিবাসী বেড়েছে। এদের একটি অংশ আসে আফ্রিকা থেকে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া থেকেও অনেকে যাচ্ছে। এসব অভিবাসীকে নিয়ে বড় কোনো পরিকল্পনাই করেনি কোনো দেশের সরকার। তবে এখন পরিকল্পনা করার সময় এসেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তা না হলে বিদ্বেষ ছড়াতে পারে, যা ক্রমেই আরও বাজে ধরনের জাতিগত বিভাজনে রূপ নিতে পারে।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Sabina Sami is a Journalist. He is the Sub-Editor of Zoom Bangla News. He is also a good writer.