ইয়েনের বিপরীতে জল্পনাভিত্তিক লেনদেনকারীদের দমন করতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপের কৌশল পরিবর্তন করছে জাপান। আগের মতো আগাম সতর্কবার্তা না দিয়ে এবার হঠাৎ করে বাজারে হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করছে দেশটির সরকার। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্রগুলোর মতে, আগের মতো নির্দিষ্ট বিনিময় হারকে ‘সীমারেখা’ হিসেবে উল্লেখ না করে জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় নীরব কৌশল গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্য হলো বাজারকে অনিশ্চয়তায় রাখা এবং ইয়েনের বিপরীতে জল্পনাভিত্তিক অবস্থান নেওয়ার ঝুঁকি ও ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া।
তাদের ভাষ্য, ইয়েনের দর একটি নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছানোর অপেক্ষা না করে বরং জল্পনাকারীদের বড় আকারের অবস্থান গড়ে উঠলেই আকস্মিকভাবে হস্তক্ষেপ করা হতে পারে।
আরও দুটি সূত্র জানিয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই কৌশল এবং জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান ইয়েনের দরপতন ঠেকাতে সমন্বিত প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে সব সূত্রই নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
গত মাসে সুদের হার বাড়ানোর পরও ইয়েনের দুর্বলতা এবং এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপ-গভর্নর রিওজো হিমিনো বলেন, বিনিময় হার জাপানের অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। দুর্বল ইয়েনের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। ব্যাংকের অন্য নীতিনির্ধারকেরাও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
গত এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের শুরু পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে রেকর্ড ১১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করে হস্তক্ষেপ করেছিল জাপান।
তবে সেই প্রভাব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গত মাসে আবারও ইয়েনের দরপতন শুরু হয়। মঙ্গলবার মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হার চার দশকের সর্বনিম্ন ১৬২ দশমিক ৬৬-এ নেমে যায়। বৃহস্পতিবার টোকিওতে মধ্যাহ্ন লেনদেনে তা ছিল ১৬২ দশমিক ৫০ ইয়েন।
আগের হস্তক্ষেপের আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বাজারে একাধিক সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। এতে জল্পনাকারীরা আগেভাগেই নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ পেয়েছিলেন। নতুন কৌশলে সেই সুযোগ আর থাকবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একটি সূত্রের ভাষ্য, ‘হস্তক্ষেপের সময় নির্ধারণ কঠিন। তবে প্রয়োজনে জল্পনাকারীদের বড় ধাক্কা দিতে কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি কোনো নির্দিষ্ট বিনিময় হার নিয়ে নয়; বরং ইয়েনের অতিরিক্ত দরপতন কীভাবে ঠেকানো যায়, সেটিই মূল বিষয়।’
কখন হস্তক্ষেপ করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে জাপানের শীর্ষ মুদ্রানীতি কর্মকর্তা আতসুশি মিমুরার ওপর। সর্বশেষ হস্তক্ষেপের পর থেকে তিনি আর কোনো মৌখিক সতর্কবার্তা দেননি।
অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাতায়ামাও মঙ্গলবার ইয়েনের নতুন দরপতনের পর কঠোর মন্তব্য এড়িয়ে শুধু বলেছেন, প্রয়োজনে যেকোনো সময় উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারের একটি অংশ আশা করছে, বৃহস্পতিবার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থানসংক্রান্ত তথ্যের কারণে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্রুত সুদের হার বাড়ানোর প্রত্যাশা কমে যেতে পারে। এতে ডলারের ঊর্ধ্বগতি শ্লথ হলে ইয়েনের ওপর চাপও কমতে পারে। তবে তা না হলে জাপানের বাজারে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জাপানের এমন পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রসহ শিল্পোন্নত সাত দেশের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সরকারি হস্তক্ষেপ সাধারণত অস্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।
বর্তমানে জাপানের নীতিগত সুদের হার ১ শতাংশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই বড় ব্যবধান ইয়েন বিক্রির প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতীতের তুলনায় এখন ইয়েনের দুর্বলতাকে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি আমদানি ব্যয় সরাসরি ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
বুধবার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ত্রৈমাসিক জরিপে দেখা গেছে, দেশটির ব্যবসায়িক আস্থা গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশাও রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। ফলে ভবিষ্যতে আরও সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



