১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ ও গণভোট নির্বাচন। এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া জাতীয় পার্টিসহ কিছু দল প্রকাশ্যে গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইন করছে। কিছু দল নীরব। কিছু দল ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরব।

আর সাম্প্রতিক সময়ে সরকারিভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচার নিয়েও মানুষের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।
আর রাজনীতিতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে- গণভোটে যদি সংস্কারপন্থী অবস্থান ‘হ্যাঁ’ জয়ী না হয়, তাহলে জুলাই সনদ ও চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ কী হবে?
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের ফলাফল নেতিবাচক হলে আইনি নয়, রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলবে। এমনকি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিপথও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখছেন কেউ কেউ।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারি বলেন, হ্যাঁ ভোট পরাজিত হলে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন হবে না।
গণতন্ত্রও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এজন্য যেভাবেই হোক হ্যাঁ কে জয়যুক্ত করা হবে। এজন্য সরকারও তো হ্যাঁ ভোটের পক্ষেই ক্যাম্পেইনে নেমেছে।
ড. বেপারি বলেন, সত্যি কথা কি আমেরিকা যা চায় তাই হবে।
আমেরিকার উইলিয়াম বি. মাইলাম তো বলেছেন, এবার আমরা সংস্কার করেই ছাড়বো। যেহেতু ওরা সংস্কার চাইছে, তার মানে হ্যাঁ জয়যুক্ত হবে। বিএনপির ৩১ দফাও তো বিরাট সংস্কার প্রস্তাব। ওটাতেও আমেরিকার সমর্থন আছে। কিন্তু জুলাই সনদটা একটু বেশি সংস্কার হয়ে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক শিক্ষক ড. রাশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন, গণভোটে হ্যাঁ পরাজিত হলে যারাই ক্ষমতায় আসবে তাদের মধ্যে স্বৈরাচার হওয়ার প্রবণতা থাকবে। তখন দেশে আবারও সরকার পতনের আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান হবে। সংঘাত ও সংঘর্ষ বাড়বে। লং টার্ম সিভিল ওয়ারের দিকে যেতে পারে দেশ। এটাই হয়তোবা কেউ কেউ চাচ্ছে। যার কারণে গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি ও প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে।
ড. রাশেদ আলম বলেন, সংস্কার প্রস্তাব বাধাগ্রস্ত হলে যদি দেশে নতুন করে আবারো গণঅভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লব হয়, তখন বিএনপি-আওয়ামী লীগকে মিডিয়া একই পক্ষে ফেলবে। জামায়াত ও এনসিপি অন্যদিকে যাবে। ওই সময় আওয়ামী লীগ বেশি ফোকাসড থাকবে আর তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে যাবে জামায়াত-এনসিপি। আর এতে করে বিএনপি তৃতীয় শক্তি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আওয়ামী লীগ ও জামায়াত-এনসিপি সংঘাত ও সংঘর্ষ হবে। বিএনপি যদি গণভোটের পরিণতি এখনও অ্যাড্রেস করতে না পারে, তাদের অবস্থান জাতীয় পার্টির মতো করিয়ে দেবে বিভিন্ন গোপন শক্তি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক আরও বলেন, গণভোটে হ্যাঁ পরাজিত হলে মানুষেরও ক্ষতি, বিএনপির জন্যও ক্ষতি, দেশের জন্যও ক্ষতি।
বিএনপির ৩১ দফাতেও তো জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংস্কারের কথা বলা আছে। পার্থক্যটা ১৯/২০। বিএনপি এখন এটা পজিটিভলি নিলে ভালো হয়। পরে ৩১ দফার আলোকে সংসদে তারা সংস্কার করতে পারবে। ৩১ দফার সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব খুব বেশি রিভলিউশনারি পার্থক্য না। তাই এখনই সবার সচেতন হওয়া উচিত দেশের স্বার্থে।
তবে গণভোটে হ্যাঁ পরাজিত হলে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হবে ড. নুরুল আমিন বেপারি ও রাশেদ আলম ভূঁইয়ার এমন মন্তব্যের সঙ্গে একমত নন অন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা।
তাদের মতে, বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের উল্লেখ থাকলেও এটি নিয়মিত শাসনপ্রক্রিয়ার অংশ নয়। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেবল সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান রয়েছে। রাজনৈতিক সনদ বা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট বাধ্যতামূলক নয়, যদি না তা আলাদা আইনে নির্ধারিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণভোটে ‘না’ ভোট পড়লে জুলাই সনদ আইনগতভাবে বাতিল হবে না, তবে এর রাজনৈতিক বৈধতা বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। তখন পুরো সনদ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা নতুন সংসদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। আর যারাই ক্ষমতায় আসবে তখন তারা যেসব বিষয়ে একমত হয়েছে সেগুলো এবং সংস্কার কমিশনে জমা দেওয়া প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া প্রস্তাবগুলো বাদ রেখে অন্য সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, জুলাই সনদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষর থাকলেও এটি কোনো আইনি চুক্তি নয়। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। গণভোটে জনগণের সমর্থন না মিললে দলগুলো চাইলে এই অঙ্গীকার থেকে সরে আসতে পারে বা নতুন বাস্তবতার কথা তুলে ধরতে পারে। তখন শেষ পর্যন্ত সংস্কারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে নতুন সংসদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সংসদের ভেতরের ঐকমত্য এবং জনগণের ধারাবাহিক চাপ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. রাশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া বড় সংস্কার টেকসই হয় না। নব্বইয়ের পর বিভিন্ন সময়ে স্বাক্ষরিত সমঝোতা ও সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
আরও পড়ুনঃ
ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইমরান আহম্মদের মতে, গণভোটে পরাজয় মানে সংস্কারের অবসান নয়, তবে তার রূপ ও গতি বদলে যেতে পারে। ২০২২ সালে চিলিতে নতুন সংবিধান গণভোটে বাতিল হয়েছিল। তখন পুরো সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া তারা নতুন করে আবার শুরু করতে হয়েছিল। কলম্বিয়াতে ২০১৬ সালে শান্তিচুক্তি গণভোটে বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু সংসদ সংশোধিত চুক্তি পাস করে। তাই গণভোটে হার-জিতের চেয়ে সক্রিয় ও কার্যকর সংসদ জরুরি।
সূত্র: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


