রমজানে ইফতারের টেবিলে গরম গরম জিলাপি দেখলে অনেকেরই মন লোভে ভরে ওঠে। সোনালি রঙের জিলাপি, চিনির সিরায় ভেজানো—এক কামড় দিলেই মুখে ছড়িয়ে পড়ে মিষ্টতার স্বাদ। সারাদিন রোজা রাখার পর এই আকর্ষণ সামলানো সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই দু-এক টুকরায় থামতে পারেন না; কখনো কখনো পুরো প্লেট ভর্তি জিলাপি খেয়ে ফেলাও অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু খালি পেটে অতিরিক্ত মিষ্টি ও ভাজাপোড়া খাবার শরীরের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। জিলাপির মতো উচ্চ চিনি ও তেলযুক্ত খাবার বেশি খেলে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা রোজার পরবর্তী দিনগুলোকে অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে।
রক্তের শর্করার হঠাৎ ওঠানামা
জিলাপিতে থাকে পরিশোধিত ময়দা এবং প্রচুর পরিমাণ চিনি। খালি পেটে এগুলো খেলে রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বেড়ে যায়। এর ফলে শরীরে হঠাৎ ইনসুলিন নিঃসরণ বেড়ে যায় এবং কিছু সময় পর রক্তে শর্করা দ্রুত কমে যায়।
এই ওঠানামার কারণে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, হাত-পা কাঁপা কিংবা অতিরিক্ত ক্ষুধা অনুভূত হতে পারে।
বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের জন্য এই অবস্থা আরও ঝুঁকিপূর্ণ। রক্তে শর্করার অস্থিরতা রোজার বাকি সময় ক্লান্তি ও অস্বস্তি বাড়িয়ে দিতে পারে।
ওজন বৃদ্ধির আশঙ্কা
জিলাপি ডুবো তেলে ভাজা এবং চিনির সিরায় ভেজানো একটি উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার। একটি মাঝারি আকারের জিলাপিতে সাধারণত ১৫০ থেকে ২০০ ক্যালরি পর্যন্ত থাকতে পারে। ফলে লোভে পড়ে চার-পাঁচটি জিলাপি খেলে সহজেই ৮০০ থেকে ১০০০ ক্যালরি শরীরে প্রবেশ করে।
রোজার দিনে সারাদিন কম ক্যালরি গ্রহণের পর ইফতারে হঠাৎ এত ক্যালরি শরীরে ঢুকলে তা অতিরিক্ত চর্বি হিসেবে জমতে শুরু করে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে স্থূলতা, পেটের মেদ বৃদ্ধি, ফ্যাটি লিভার বা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
রমজানে অনেকে ওজন কমানোর আশা করেন, কিন্তু অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মিষ্টি খাওয়ার কারণে অনেক সময় উল্টো ওজন বেড়ে যায়।
হজমের সমস্যা ও অ্যাসিডিটি
সারাদিন না খেয়ে থাকার পর হঠাৎ বেশি তেল ও চিনি জাতীয় খাবার খেলে পেটে গ্যাস, অম্বল, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। জিলাপির মতো খাবারে থাকা পরিশোধিত চিনি ও ট্রান্স ফ্যাট হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
যাদের আগে থেকেই গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ আরও তীব্র হতে পারে।
এর ফলে রোজার পরবর্তী দিনগুলোতে পেটের অস্বস্তি, বুকজ্বালা বা বদহজমের কারণে রোজা রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
হৃদস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
অতিরিক্ত চিনি ও ট্রান্স ফ্যাট দীর্ঘমেয়াদে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে। বিভিন্ন পুষ্টি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে।
রমজানজুড়ে যদি প্রতিদিনই বেশি পরিমাণ জিলাপি বা অন্যান্য মিষ্টি খাওয়া হয়, তাহলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) বেড়ে যেতে পারে এবং হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে সমাধানও আছে
ইফতারে জিলাপি পুরোপুরি বাদ দিতে না চাইলে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করাই সবচেয়ে ভালো উপায়। একটি ছোট টুকরা জিলাপি খেলেই মিষ্টির স্বাদ নেওয়া যায়।
ইফতার শুরু করা যেতে পারে ফল, খেজুর বা পানি দিয়ে। এতে রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কিছুটা কম হয়।
বাড়িতে কম তেলে তৈরি জিলাপি বা স্বাস্থ্যকর বিকল্প মিষ্টি বেছে নেওয়াও ভালো অভ্যাস হতে পারে। বাদাম, খেজুর বা ফল দিয়ে তৈরি মিষ্টি খেলে মিষ্টির চাহিদা পূরণ হয় এবং ক্যালরিও নিয়ন্ত্রণে থাকে—এমন পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা।
জিলাপি আনন্দ ও উৎসবের খাবার, প্রতিদিনের নয়। রমজানে স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হলে মিষ্টি ও ভাজাপোড়ার প্রতি সংযম দেখানোই সবচেয়ে বড় কৌশল। পরিমিত খাওয়ার অভ্যাসই আপনাকে সুস্থ রেখে রোজার মাসটিকে আরও স্বস্তিদায়ক করে তুলবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


