নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর: সপ্তাহের প্রতিটি রোববার ভোর হলেই টঙ্গী বাজার এলাকা বদলে ফেলে চেনা রূপ। আশপাশের গ্রাম তো বটেই, দূরদূরান্ত থেকেও বিক্রেতা ও ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে কবুতর, পাখি ও হাঁস-মুরগির সাপ্তাহিক হাট। ডানা ঝাপটানোর শব্দ, রঙিন পালকের ঝিলিক আর দরদামের কোলাহলে এই হাট যেন শহরের ভেতর এক টুকরো গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি।

শীত মৌসুম শুরু হতেই বাজারে হাঁসের আধিপত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক বিক্রেতা জানান, অন্য সময় যেখানে সপ্তাহে ১০–১৫টি হাঁস বিক্রি হয়, শীতে তা বেড়ে যায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি। হাঁসের আকার, জাত ও স্বাস্থ্য অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হলেও ভালো ও বড় হাঁসের জন্য ক্রেতারা বাড়তি দাম দিতেও পিছপা হন না। এতে করে এই সময়টায় খামারি ও ছোট ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক ভালো লাভের মুখ দেখেন।
এই হাটের বড় আকর্ষণ দরদামের নিজস্ব সংস্কৃতি। কেউ হাঁস হাতে নিয়ে ওজন যাচাই করছেন, কেউ দাঁত দেখে বয়স বোঝার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ পালক উল্টে দেখে নিচ্ছেন স্বাস্থ্য। বিক্রেতারাও কম যান না-কতদিনের হাঁস, কী খাবার খেয়েছে, রান্নার পর কতটা ওজন হবে-সব গুণাগুণ তুলে ধরে ক্রেতাকে রাজি করানোর চেষ্টা চলে। কখনো কয়েক মিনিটে, কখনো আধা ঘণ্টা পর্যন্ত গড়ায় এই দরকষাকষি।

হাঁসের পাশাপাশি কবুতর ও নানা জাতের পাখিরও আলাদা কদর আছে এই হাটে। শখের কবুতর পালনকারীরা নতুন জাতের খোঁজে নিয়মিত আসেন। কেউ আবার কবুতর কেনেন খাবারের উদ্দেশ্যে। পাশাপাশি দেখা যায় বাজরিগার, লাভবার্ডসহ নানা রঙের দেশি-বিদেশি পাখি। এসব খাঁচার সামনে শিশু-কিশোরদের ভিড় চোখে পড়ার মতো।
এক বিক্রেতার ভাষ্য, শখের পাখির বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল। মৌসুম বদলালেও পাখিপ্রেমীরা নিয়মিতই কেনাকাটা করেন। তবে শীতকালে হাঁস-মুরগির চাহিদা বেশি থাকায় পাখির দিকে তুলনামূলক কম নজর পড়ে।

এই সাপ্তাহিক হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ছোট খামারি, মধ্যস্বত্বভোগী, খাঁচা তৈরির কারিগর, খাবার বিক্রেতা-সবারই কোনো না কোনোভাবে আয় আসে এই হাটকে ঘিরে। সপ্তাহে একদিন হলেও এই বাজার বহু পরিবারের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শীত মৌসুমকে সামনে রেখে খামারিরা আগেভাগেই হাঁস পালনের প্রস্তুতি নেন। কেউ বাড়িতে হাঁস বড় করেন, কেউ আবার অন্য এলাকা থেকে কিনে এনে টঙ্গীর হাটে বিক্রি করেন। ফলে রোববারের এই হাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে একটি ছোট কিন্তু সক্রিয় অর্থনৈতিক চক্র।

আধুনিক শহরের ব্যস্ততার মাঝেও টঙ্গীর এই সাপ্তাহিক হাট টিকিয়ে রেখেছে খোলা দরদাম, মুখোমুখি বেচাকেনা আর বিশ্বাসের সম্পর্ক। শীতের সকালে হাঁসের ডাক, কবুতরের ডানা ঝাপটানো আর মানুষের দরকষাকষির শব্দ মিলিয়ে এই হাট যেন এক জীবন্ত দৃশ্যকাব্য।
রোববার এলেই তাই টঙ্গীর এই বাজারে জমে ওঠে ভিড়। আর শীত নামলেই সেই ভিড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে হাঁস। এই হাটের চেনা দৃশ্য শুধু কেনাবেচার গল্প নয়; এটি মানুষের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও মৌসুমি বাস্তবতার বাস্তব প্রতিফলন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


