থাইল্যান্ডে আগ্রাসী প্রজাতির একটি তেলাপিয়া মাছ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে চিংড়ি চাষ, উপকূলীয় মৎস্যসম্পদ এবং দেশীয় জলজ প্রাণীর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। পশ্চিম আফ্রিকার এই ‘ব্ল্যাকচিন তেলাপিয়া’ এরই মধ্যে অন্তত ১৯টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। দ্রুত বংশবিস্তার, বিভিন্ন ধরনের পানিতে টিকে থাকার ক্ষমতা এবং দেশীয় প্রজাতির খাদ্য ও আবাসস্থল দখল করে নেওয়ায় থাইল্যান্ডের মৎস্য খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন এই তেলাপিয়া পুরোপুরি নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব।
চিংড়ি খামার ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন অনেক চাষি
থাইল্যান্ডের সামুত সংখ্রাম প্রদেশের জেলে ওয়ালপ খুনজায়েন বলেন, মাত্র দুই মাসের মধ্যে তার খামারের প্রায় ১০ লাখ চিংড়ির পোনা ব্ল্যাকচিন তেলাপিয়া খেয়ে ফেলে।
তিনি বলেন, ‘ওরা সবকিছু খেয়ে ফেলেছে। চিংড়ি খেয়েছে, এমনকি কাঁকড়াও খেয়ে ফেলেছে।’
এরপর তিনি চিংড়ি চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তার কথায়, আগের মতো স্থানীয় বিভিন্ন মাছ ও কাঁকড়াও এখন আর দেখা যায় না।
ছড়িয়ে পড়েছে ১৯ প্রদেশে
থাইল্যান্ডে ব্ল্যাকচিন তেলাপিয়ার উপস্থিতি প্রথম ধরা পড়ে ২০১১ সালে রাজধানী ব্যাংককের দক্ষিণে সামুত সংখ্রাম এলাকায়। এরপর থেকে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত ১৯টি প্রদেশে।
খাল, নদী, উপকূলীয় এলাকা এমনকি পর্যটনকেন্দ্র পাতায়ার জলাশয়েও এই তেলাপিয়া পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এটি ভবিষ্যতে থাইল্যান্ডের সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কেন এত বড় সমস্যা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্ল্যাকচিন তেলাপিয়া খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে। ছোট মাছের বেঁচে থাকার হারও বেশি। ফলে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও অল্প সময়ের মধ্যে আবার সংখ্যায় বেড়ে যায়।
এছাড়া এই তেলাপিয়া মিঠা ও লোনা—উভয় ধরনের পানিতেই সহজে টিকে থাকতে পারে।
থাইল্যান্ডের খন কায়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক থোৎসাপোল চাইয়ানুনপর্ন বলেন, ‘আমরা সেই অবস্থার অনেক বাইরে চলে গেছি, যেখান থেকে এই মাছ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব।’
খেতে চান না কেউ
বিশ্বের দরবারে থাইল্যান্ডের রান্নার বেশ সুনাম রয়েছে। তবে এই কুখ্যাত মাছটি কেউই খেতে আগ্রহী নন। সামুত প্রাকানের মাছ বাজারের এক বিক্রেতা টোংটা সামতিয়া বলেন, তিনি এই মাছ বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু কেউ কেনেনি। মানুষ এটি কীভাবে খেতে হয় তা জানে না। মাছটি দেখতেও সুন্দর নয়।
ব্যাংককের একজন জেলে থানান্দন চারোয়েনহিরানসাকু সংকটের তীব্রতা তুলে ধরে বলেন, জালে তিনবার টান দিলে অনায়াসে ২০ থেকে ৩০ কেজি এই তেলাপিয়া উঠে আসে। আমাদের খালগুলো এখন এই মাছে ভরা। তিনি কেবল আশা করেন, এই মাছ যেন প্রতিবেশীদের দেশে আর না ছড়ায়। তিনি এটিকে একটি নীরব ঘাতক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
কীভাবে ছড়াল?
এই তেলাপিয়া কীভাবে থাইল্যান্ডে ছড়িয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। জেলেদের একটি সংগঠন কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান চ্যারোয়েন পোকফান্ড ফুডস পিএলসির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, গবেষণার জন্য ২০১০ সালে আমদানি করা ব্ল্যাকচিন তেলাপিয়া থেকেই এই বিস্তার ঘটেছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, গবেষণার জন্য আনা সব মাছ ধ্বংস করা হয়েছিল এবং তাদের গবেষণাকেন্দ্র ছিল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা।
পরিবেশের জন্যও হুমকি
গবেষকদের মতে, এই তেলাপিয়া শুধু দেশীয় মাছের সঙ্গে খাদ্য ও আবাসস্থলের প্রতিযোগিতাই করছে না, জলজ পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ডিম দেওয়ার সময় স্ত্রী মাছ বালিতে অসংখ্য গর্ত তৈরি করে। এতে তলদেশের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে পানির নিচের উদ্ভিদের আলোকসংশ্লেষণও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া ব্ল্যাকচিন তেলাপিয়া জুপ্ল্যাঙ্কটন খেয়ে ফেলে। অথচ জুপ্ল্যাঙ্কটন শৈবাল নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তেলাপিয়া নিয়ন্ত্রণে কী করছে থাইল্যান্ড
এই তেলাপিয়া নিয়ন্ত্রণে থাইল্যান্ড সরকার কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক শিকারি হিসেবে এশিয়ান সি বাস মাছ ছাড়া, বন্ধ্যা বংশধর উৎপাদন করতে পারে—এমন ব্ল্যাকচিন তেলাপিয়া উন্নয়ন এবং বেশি করে তেলাপিয়া ধরতে উৎসাহ দিতে জেলেদের অর্থ দেওয়া।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে হাজার হাজার টন ব্ল্যাকচিন তেলাপিয়া জলাশয় থেকে অপসারণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এই তেলাপিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবহার বাড়ানো। যেমন পশুখাদ্য, মাছের সস বা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার।
গবেষকেরা এখন পরিবেশগত ডিএনএ (eDNA), পানির নিচের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা এবং শব্দতরঙ্গ বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব আগ্রাসী মাছ শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করছেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



