গাজীপুরের কালীগঞ্জের দক্ষিণ সোম গ্রামের মোজাম্মেল হকের মেয়ে হায়েজা আক্তার মালার (৩৪) দুই সন্তানসহ আত্মহত্যার ঘটনায় পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মালার মেয়ের স্কুলের শিক্ষকদের কাছে দেবর কর্তৃক নির্যাতনের অভিযোগ ছিল তার। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সকালে মেয়ের ব্যাগ স্কুলে রেখেই দুই সন্তানকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন মা।

নিহত হাফেজা আক্তার মালা গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ সোম গ্রামের মোজাম্মেল হকের মেয়ে।
যে দুই সন্তান নিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন তারা হলো- তাবাসসুম আক্তার নুসরাত (৯) ও মারুফ (৫)। দক্ষিণ সোম গ্রামের পাশে আতুরী গ্রামে সালাউদ্দিনের ছেলে উজ্জ্বল হোসেনের সঙ্গে মালার বিয়ে হয়। নুসরাত আতুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ত। মারুফ স্কুলে যেত না।
সরেজমিন অনুসন্ধান জানা যায়, মেয়ে নুসরাতের স্কুলে মা মালার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। মেয়েকে স্কুলে দিয়ে মালা প্রায়ই স্কুলের মেডামদের কাছে অভিযোগ করতেন যে, তার দেবর সজিব হোসেন তাকে তার স্বামী ও শ্বশুরের সামনে প্রায়ই মারধর করতেন। কিন্তু স্বামী বা শ্বশুর কিছুই বলতেন না। এ নিয়ে মালা খুব কষ্ট পেতেন।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ৯টায় মালা মেয়ের স্কুলে যায় ও দুজন মেডামের কাছে জানায়, তার দেবর আবারো মারধর করেছে। তিনি তার দুই সন্তান নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যাবেন। এই কথা বলে মেয়ে নুসরাতকে নিয়ে যেতে চাইলে মেডামরা বাধা দেয়। একপর্যায়ে মেয়ের স্কুল ব্যাগ মেডামদের কাছে রেখে মেয়েকে নিয়ে চলে যায়। মেডামরা ব্যাগ নিয়ে যেতে বললে মালা জানায়, ফিরে আসলে কোনো এক সময় ব্যাগ নিয়ে যাবে।
এই বলে সঙ্গে থাকা ছেলে মারুফ ও স্কুল থেকে মেয়ে নুসরাতকে নিয়ে চলে যায় মালা। এরপর সোমবার সকাল ১১টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের নয়ানীপাড়া রেল ক্রসিংয়ের অদূরে পূবাইলে দুই শিশু সন্তানসহ ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে তিনজনই আত্মহত্যা করেন।
স্থানীয় রেল ক্রসিংয়ের গেটম্যান আব্দুস সাত্তার জানান, সোমবার সকালে গাজীপুর মহানগরীর পূবাইল রেল ক্রসিংয়ের পূর্ব পাশে নয়ানীপাড়া এলাকায় দুই সন্তানকে নিয়ে রেললাইনের ওপর দিয়ে হাঁটছিলেন মালা বেগম। এ সময় গেটম্যান তাদের রেললাইন থেকে সরে যাওয়ার জন্য ডাকাডাকি করেন। ট্রেন দেখে ওই নারীর ছেলে ও মেয়ে সরে যেতে চাইলেও তিনি তাদের নিয়ে চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। অতঃপর পুলিশ তিনটি লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
ঘটনাস্থল পূবাইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, পারিবারিক কারণে মা তার দুই সন্তান নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে জেনেছি। যেহেতু বিষয়টি রেলওয়ে পুলিশের আওতাধীন তাই তারাই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন।
এ বিষয়ে ভৈরব রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইদ আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, লাশ তিনটি থানায় আনা হয়েছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
ঘটনার পর গণমাধ্যমের নিকট মালার পরিবার অভিযোগ করে বলেন, দেবর প্রায়ই মালাকে মারতে যেতেন। এটা তারা শুনেছেন।
এই বিষয়ে আতুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক দিলরুবা জাহান ও তাসলিমা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, নুসরাতের মা মালা মেয়েকে আনা-নেওয়ার জন্য প্রায়ই স্কুলে যাতায়াত করতেন। দেবর তাকে স্বামী ও শ্বশুরের সামনে প্রায়ই মারধর করত বলে তাদের জানিয়েছেন।
ঘটনার দিন সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নুসরাতের মা মালা দেবরের মারধরের কথা আবারো তাদের জানিয়ে বাবার বাড়ি চলে যাবে বলে মেয়েকে নিতে চায়। আমরা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেও পারিনি। এক সময় মেয়ের ব্যাগ স্কুলে রেখেই মেয়েকে নিয়ে চলে যায় মালা। ব্যাগটি বর্তমানে স্কুলেই যত্ন করে রাখা আছে। এসময় মালার সঙ্গে তার ছেলেও ছিল। অতঃপর ছেলে ও মেয়ে নিয়ে মালা স্কুল ত্যাগ করেন।
সোমবার সন্ধ্যায় আতুরী গ্রামে মালার শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে স্বামী উজ্জ্বলকে ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবার থেকে বলা হয়, উজ্জ্বল অজ্ঞান হয়ে ঘুমিয়েছে। তবে বাড়িতে সবাই থাকলেও মালার দেবর সজিবকে পাওয়া যায়নি। সজিব কোথায় এমন প্রশ্নের সদোত্তর বাড়ির কেউ দেয়নি। সজিবের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফোনটি ফরোয়ার্ড করে রাখা হয়েছে। উজ্জ্বলদের বাড়ির একাধিক প্রতিবেশী জানায়, ভাবিকে মারধর করত সজিব। ভাবি দুই সন্তান নিয়ে আত্মহত্যা করার পর থেকে সে পালিয়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানায়, পুলিশের মাধ্যমে দুই পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। মঙ্গলবার লাশ আতুরী গ্রামে দাফন করা হবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


