প্রস্তুতি শুরু

Advertisement
নির্দলীয় স্থানীয় সরকারের (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ) নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো। ইতিমধ্যে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে। নির্দলীয় এই নির্বাচনে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে ইসি। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে আইনি সংশোধনীর কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের প্রচারণায় পোস্টার থাকছে না—এমনটাই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে ইসির নীতিনির্ধারকরা। তবে চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন ইসির সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, কমিশনের সামনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আমরা এ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছি। আমাদের লক্ষ্য এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে সব নির্বাচন সম্পন্ন করা। এ নির্বাচনের আগে প্রয়োজনীয় আইন, বিধি ও নীতিমালা সংশোধন, বাজেট বরাদ্দ, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং মৌসুমি বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। গত ৫ মে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের সব নির্বাচন সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হবে। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, ‘অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করতে সাধারণত ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাধারণত ধাপে ধাপে সারা দেশে অনুষ্ঠিত হয়। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনসহ সব স্তরের নির্বাচন শেষ করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়।

দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন, ৪৯০টির মতো উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টির মতো পৌরসভা ও ৬১টি জেলা পরিষদের নির্বাচন মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এগুলো এখনই নির্বাচন করার উপযোগী। এসব নির্বাচন আয়োজনে আইনগত কোনো জটিলতা নেই। এছাড়া সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে প্রায় ৬০০ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করার যে ১৮০ দিন সময়সীমা রয়েছে, তা এপ্রিল মাসে শুরু হয়েছে। আগামী জুলাই মাসের মধ্যে আরো ২ হাজার ৮০০-এর বেশি ইউনিয়ন পরিষদের সময়সীমা শুরু হবে। এ অবস্থায় সরকারের সবুজ সংকেত পেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করতে পারবে ইসি। যদিও সরকারের তরফে এ বছরের শেষ দিকে স্থানীয় নির্বাচন শুরু করার কথা বলা হচ্ছে।

ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময়ে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়। ঐ আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং উপজেলা, জেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন পরিচালনায় বিধিমালায় দলীয়ভাবে ভোটের বিধি-বিধান রয়েছে। এমনকি দলীয়ভাবে নির্বাচনি প্রচারেরও সুযোগ আছে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বাতিলের লক্ষ্যে সিটি কর্পোরেশন আইনের ৩২(ক), পৌরসভা আইনের ২০(ক), উপজেলা পরিষদ আইনের ১৬(ক), এবং ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ১৯(ক) ধারা বাতিল করে সংসদে পৃথক আইন পাশ হয়। ঐ আইন অনুযায়ী, প্রতিটি নির্বাচনের পরিচালনা এবং আচরণ বিধিমালায় সংশোধনী আনার কাজ শুরু হয়েছে। নির্বাচন আয়োজনের আগে এসব সংশোধনী আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা বাড়ালেন বিজয়

ডিসিদের ইসির প্রস্তুতির নির্দেশনা : চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে—এমনটি ধরে এসব প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। জেলা প্রশাসকদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছে ইসি। তাদেরকে আরো বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে মানের হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেই মানের ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে। মঙ্গলবার জেলা প্রশাসন সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ও চার নির্বাচন কমিশনার তাদের বক্তব্যে এসব নির্দেশনা দেন। এর মধ্য দিয়ে মূলত: মাঠ প্রশাসনকে নির্বাচনের আগাম বার্তা দিল কমিশন।

একক বিধিমালা হচ্ছে না : স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একক বিধিমালা প্রণয়নের সুপারিশ ছিল নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের। ঐ প্রস্তাব আমলে নিবে না ইসি। প্রতিটি নির্বাচনের জন্য প্রচলিত বিধিমালাগুলো বহাল রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। সেগুলোতে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। এছাড়া বিলবোর্ডের মাধ্যমে প্রচার চালানোসহ সংসদ নির্বাচনে যেসব নতুন নিয়মের প্রচলন করেছে ইসি, সেগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আনতে চায় কমিশন। স্থানীয় নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের সুযোগ না রাখার পক্ষে ইসি। ফলে পলাতক ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে না।

রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা ইসির : স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা প্রভাব বিস্তার করলে তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়—তা নিয়েও ভাবছে ইসি। সামনের দিনগুলোতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে প্রতিটি উপজেলায় সংসদ সদস্যদের সরকারিভাবে কার্যালয় তৈরি করছে সরকার। এই অবস্থায় সংসদ সদস্যরা উপজেলা কার্যালয়ে বসে নির্বাচনে যেন হস্তক্ষেপ করতে না পারে, সে লক্ষ্যে আচরণ বিধিমালায় নতুন ধারা-উপধারা যুক্তের চিন্তা করছে ইসি। এছাড়া নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালায় মনোনয়নপত্রের ফরমে পরিবর্তন, প্রার্থীর বিদেশে থাকা সম্পদের বিবরণ হলফনামায় উল্লেখ করা এবং দলীয় মনোনয়নে প্রার্থী হওয়া ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষর যুক্ত করার বিধান বাতিল করতে যাচ্ছে ইসি। অপরদিকে আচরণ বিধিমালায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহারের নতুন বিধান যুক্ত করা হবে। এক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় ইসি।

প্রার্থী হওয়ার পথ সহজ হচ্ছে : ইসির কর্মকর্তারা জানান, পরিচালনা বিধিমালায় সংশোধনী আসলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পথ সহজ হবে। নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠেয় এসব নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের প্রয়োজন হবে না। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষরসহ নামের তালিকা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, তা থাকবে না। ফলে আইন অনুযায়ী যোগ্য যে কেউ প্রার্থী হতে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। এছাড়া নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে না। সব প্রার্থী নির্দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি ও প্রার্থিতা ঘোষণা : বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ইতোমধ্যে এলাকায় এলাকায় গণসংযোগ করছেন। তাদের পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানারে সয়লাব হাট-বাজার, গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অলিগলি ও জনসমাগমস্থল। নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরতে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন এসব প্রার্থী। ভোটারদের মনোযোগ টানতে ব্যক্তিগত যোগাযোগের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জোর দিচ্ছেন তারা। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা তৃণমূলের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন। জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের দলীয় প্রস্তুতি রয়েছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার পর দলীয় পূর্ণ শক্তি নিয়ে সবাই (নেতাকর্মী) ভোটের মাঠে নামবে। সরকারের কার্যক্রমের সফলতায় জাতীয় নির্বাচনের সাফল্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পড়বে বলে মনে করেন বিএনপির এ সিনিয়র নেতা।

তিনি বলেন, ‘সরকার গঠনের পর গত তিন মাসে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের যে অর্জনগুলো রয়েছে, তাতে জনমনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। এ কারণেই আমাদের নেতাকর্মীরা অধিকাংশ স্থানে বিজয়ী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এদিকে, ইতিমধ্যে ১২টি সিটি করপোরেশনে জামায়াতে ইসলামী তারণ্য নির্ভর প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটির সম্ভাব্য নামও ঘোষণা করা হয়েছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দলীয় প্রার্থীদের চূড়ান্ত করা হচ্ছে। প্রার্থী বাছাইয়ে অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব যোগ্যতায় কিছু এলাকায় ১১-দলীয় ঐক্যের শরিকদের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথম ধাপে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র পদে ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত ১০ মে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়। এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে আসা ও রাজনীতির বাইরে থাকা যোগ্য ব্যক্তিদের যাচাই-বাছাই করে এই প্রার্থী তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Arif Arman is a journalist associated with Zoom Bangla News, contributing to news editing and content development. With a strong understanding of digital journalism and editorial standards, he works to ensure accuracy, clarity, and reader engagement across published content.