Advertisement
জুমবাংলা ডেস্ক : নোয়াখালীর ডেল্টা জুট মিল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হোসাইন আহমেদ অবসরে গেছেন ২০২২ সালের ১ মার্চ। তিনি এখনো তার অবসর সুবিধার (পেনশন) টাকা পাননি। প্রায়ই তিনি রাজধানীর পলাশীর ব্যানবেইস ভবনে অবসর সুবিধা বোর্ডে এসে খবর নেন। কিন্তু প্রতিবারই তাকে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়। কবে তিনি প্রাপ্য টাকা পাবেন, তা জানাতে পারেননি অবসর বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কালের কণ্ঠের করা প্রতিবেদন থেকে বিস্তারিত-

গত বুধবার অবসর সুবিধা বোর্ডের সামনে হোসাইন আহমেদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘৩৫ বছর শিক্ষকতা করে প্রায় তিন বছর আগে অবসরে গেছি। ছেলেমেয়েরাও সেভাবে সচ্ছল নয়।

নানা রোগে ভুগছি। মনে করেছিলাম, পেনশনের টাকাটা পেলে একটু ভালো করে চিকিৎসা করাব। ছেলের একটা কর্মের ব্যবস্থা করব। কিন্তু কবে টাকা পাব, তা বলতে পারছে না কেউ।’

শুধু হোসাইন আহমেদই নন, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৭৪ হাজারের বেশি শিক্ষক অবসর ও কল্যাণের টাকার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। প্রতিদিনই শত শত শিক্ষক পেনশনের টাকার জন্য ধরনা দিচ্ছেন ব্যানবেইস ভবনে। শিক্ষক-কর্মচারীদের আবেদনের চার বছরেও মিলছে না টাকা। পেনশনের টাকা পেতে বড় পেরেশানির মধ্যে পড়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সব শিক্ষকের পাওনা একবারে পরিশোধ করতে সরকারের কাছ থেকে এককালীন সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ প্রয়োজন।

প্রতিবছর বাজেটে ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। কিন্তু অবহেলিত এসব শিক্ষকের পেনশনের টাকা পরিশোধ করতে সরকারের তেমন আগ্রহ নেই। এমনকি সব কিছু জেনেশুনে নিশ্চুপ শিক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয়।

সূত্র জানায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশনের জন্য রয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট। শিক্ষকদের প্রতি মাসের মূল বেতন থেকে অবসর বোর্ডে কেটে নেওয়া হয় ৬ শতাংশ এবং কল্যাণ ট্রাস্টে কেটে নেওয়া হয় ৪ শতাংশ টাকা। কিন্তু বেতন থেকে কেটে নেওয়া অর্থে পেনশনের পুরো টাকা পরিশোধ করা সম্ভব নয়। আর সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর বাজেটে এবং চাহিদামতো এককালীন থোক বরাদ্দ না দেওয়ায় ৭৪ হাজার শিক্ষকের আবেদনের স্তূপ জমা হয়েছে। এর মধ্যে অবসর বোর্ডে আবেদন জমা রয়েছে ৩৮ হাজার এবং কল্যাণ ট্রাস্টে আবেদন জমা ৩৬ হাজার।

অবসর সুবিধা বোর্ড সূত্র জানায়, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া ৬ শতাংশ অর্থে প্রতি মাসে জমা হয় ৭০ কোটি টাকা। বোর্ডের এফডিআর থেকে আসে তিন কোটি টাকা। প্রতি মাসে মোট আয় হয় ৭৩ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতি মাসে যতসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে যান, তাদের পেনশনের টাকা পরিশোধ করতে প্রয়োজন ১১৫ কোটি টাকা। ফলে প্রতি মাসে ঘাটতি থাকে ৪২ কোটি টাকা। এভাবে আবেদন জমতে জমতে চার বছরেরও বেশি ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এতে একজন শিক্ষক অবসরে যাওয়ার চার বছরেরও বেশি সময় পরে টাকা পাচ্ছেন না।

অবসর সুবিধা বোর্ডের সদস্যসচিব (রুটিন দায়িত্ব) অধ্যাপক মো. জাফর আহম্মদ বলেন, ‘আমরা অনলাইনে আবেদন নিই। কিন্তু শিক্ষকরা যখন টাকা না পান, তখন তারা সরাসরি খোঁজ নিতে আসেন। তবে কোনো সুখবর দিতে পারি না। বর্তমানে জমা থাকা সব আবেদন নিষ্পত্তি করতে আমাদের চার হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। এরপর প্রতিবছরের বাজেটে যদি আমাদের বোর্ডের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহলে সবাই আবেদনের সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাবেন। আমরা ব্যাপারটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বারবার জানাচ্ছি।’

কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্র বলেছে, ‘শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতন থেকে পাওয়া ৪ শতাংশ অর্থে আমাদের ফান্ডে প্রতি মাসে জমা হয় ৫০ কোটি টাকা। আর ট্রাস্টের এফডিআর থেকে মাসে পাওয়া যায় দুই কোটি টাকা। ফলে সব মিলিয়ে আমাদের মাসে আয় হয় ৫২ কোটি টাকা। অথচ প্রতি মাসে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন ৬৫ কোটি টাকা। ফলে প্রতি মাসে ঘাটতি থেকে যায় ১৩ কোটি টাকা।’

সূত্র জানায়, অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে পৃথকভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশনের টাকা পরিশোধ করা হয়। ২০২০ সালের আগস্টে যেসব শিক্ষক আবেদন করেছিলেন, তারা এখন অবসর বোর্ডের টাকা পাচ্ছেন। আর ২০২২ সালের মার্চে যারা কল্যাণ ট্রাস্টে আবেদন করেন, তারা এখন তাদের পেনশনের টাকা পাচ্ছেন।

কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. আবুল বাশার বলেন, ‘প্রতি মাসে যে ঘাটতি থাকছে, তা জমতে জমতে ৩৬ হাজার শিক্ষকের আবেদন জমে গেছে। এসব আবেদন একবারে নিষ্পত্তি করতে সরকারকে এককালীন তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দিতে হবে। এর পর থেকে যদি প্রতিবছরের বাজেটে কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহলে আবেদন করার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকরা পেনশনের টাকা পেয়ে যাবেন। আমরা ব্যাপারটি মন্ত্রণালয়কে জানালেও এখনো কোনো সদুত্তর পাইনি।’

জানা যায়, পেনশনের টাকা পেতে দীর্ঘসূত্রতা হওয়ায় এত দিন অসুস্থ ব্যক্তি, হজযাত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আবেদন অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু গত চার মাসে এ ব্যাপারটিও অনুপস্থিত। ফলে আগামী বছর হজের জন্য নিবন্ধন করে অনেক শিক্ষক অবসর বোর্ড বা কল্যাণ ট্রাস্টে আবেদন করলেও এতে সাড়া পাচ্ছেন না। এ ছাড়া এই দুই সংস্থার ব্যাংক অ্যাকাউন্টই দুর্বল ব্যাংকে। ফলে সেসব ব্যাংকে জমা হওয়া টাকাও তারা ব্যবহার করতে পারছেন না। এতে গত চার মাসে নতুন কোনো আবেদন নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া গত বছর থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষকদের পেনশন বাবদ ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়। কিন্তু সে টাকাও এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।

লক্ষ্মীপুরের দত্তপাড়া ডিগ্রি কলেজের সাবেক সহকারী অধ্যাপক আবুল খায়ের মুহাম্মদ আব্দুর রব অবসরে যান ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। তিনি হজের জন্য নিবন্ধন আবেদনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এসেছেন অবসর বোর্ডে। কিন্তু তার আবেদনটিই গ্রহণ করা হয়নি।

গত বুধবার ব্যানবেইস ভবনে দাঁড়িয়ে আবুল খায়ের মুহাম্মদ আব্দুর রব বলেন, ‘দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল পেনশনের টাকা দিয়ে হজে যাব। আগে একটা নিয়ম ছিল হজে গেলে আগে টাকা দিয়ে দেয়। এ জন্য হজ নিবন্ধনসহ সব কিছু করলাম। এখন অবসর বোর্ডে আবেদন নিয়ে এসেছি। কিন্তু আমার আবেদন তো রাখলই না, উল্টো দুর্ব্যবহার করল। এখন মনে হচ্ছে শিক্ষকতা পেশায় এসে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছি। আমার ছাত্ররা কত বড় বড় সরকারি চাকরি করে, লাখ লাখ কোটি টাকার বাজেট করে, কিন্তু আমাদের এই সামান্য টাকার খেয়াল রাখে না।’

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর পারুলিয় উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. কাওছার আলী। তিনি বলেন, ‘আড়াই বছর হলো অবসরে, কিন্তু পেনশনের টাকার খবর নেই। অথচ এই টাকা নিয়ে অনেক পরিকল্পনা করেছিলাম। শিক্ষক হিসেবে নামমাত্র বেতনে চাকরি করেছি। আমাদের কষ্ট কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়।’

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) অধ্যাপক এ বি এম রেজাউল করীম বলেন, ‘প্রতি মাসে যে পরিমাণ টাকার দরকার, এর সংস্থান যেহেতু নেই, সেহেতু আবেদন জমে যাচ্ছে। তবে সমস্যা সমাধানে এককালীন থোক বরাদ্দ প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যাপারটা অবগত। তাদের প্রস্তাবও আছে। কিন্তু টাকাটা দেবে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে আমরা শিক্ষকদের জন্য এখনো প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাইনি।’

ক্ষমা চাইলেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saumya Sarakar serves as an iNews Desk Editor, playing a key role in managing daily news operations and editorial workflows. With over seven years of experience in digital journalism, he specializes in news editing, headline optimization, story coordination, and real-time content updates. His work focuses on accuracy, clarity, and fast-paced newsroom execution, ensuring breaking and developing stories meet editorial standards and audience expectations.