জাহিদ ইকবাল: নির্বাচন সামনে এলেই আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশ অস্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে—এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবার যেভাবে পারস্পরিক বিষোদগার, ব্যক্তিগত আক্রমণ, কাদা ছোড়াছুড়ি আর উত্তেজনাকর ভাষা ছড়িয়ে পড়ছে, তা একজন সাধারণ শান্তিকামী নাগরিক হিসেবে উদ্বেগ তৈরি করে। গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবে, তর্ক হবে—কিন্তু শালীনতা হারিয়ে গেলে রাজনীতির মূল উদ্দেশ্যটাই দুর্বল হয়ে যায়।

ভোট মানে শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; ভোট মানে জনগণের আস্থা অর্জনের প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতায় কে কাকে কত কঠোর ভাষায় আক্রমণ করলো—তা নয়, বরং কে দেশের জন্য কত বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দিল—সেটাই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভোটারদের বড় অংশ সিদ্ধান্ত নেয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বিষয় দেখে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সুশাসনকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমাদের দেশও এর বাইরে নয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী—তরুণ জনগোষ্ঠীর হার এখন খুব বেশি। প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে। তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা—এসব নিয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা জরুরি।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে এসব বাস্তব ইস্যু অনেক সময় আড়ালে পড়ে যাচ্ছে ব্যক্তিগত আক্রমণ আর উত্তপ্ত বক্তব্যের ভিড়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নতুন ভোটার। কয়েক কোটি নতুন ভোটার ইতোমধ্যে ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছে। এই প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়, তথ্য যাচাই করতে পারে, তুলনা করতে পারে। তারা শুধু আবেগতাড়িত স্লোগান নয়—সংখ্যা, তথ্য ও বাস্তব কর্মপরিকল্পনা দেখতে চায়। কে কত উন্নয়ন করবে, কীভাবে স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করবে, কীভাবে বাজারদর নিয়ন্ত্রণে আনবে—এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর তারা আশা করে।
রাজনীতিতে সহিংস ভাষা ও আচরণের একটি বাস্তব ঝুঁকিও আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের আক্রমণাত্মক বক্তব্য মাঠপর্যায়ে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়। অতিউৎসাহী কর্মীরা সেটিকে অনুমতি হিসেবে ধরে নেয়। ফলে ছোট ঘটনা বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম—সবকিছু।
মানুষ আরও কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর চায়—
দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহি কীভাবে শক্ত হবে।
আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ও মান কীভাবে বাড়বে।
স্থানীয় সরকার ও সেবাদান ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর হবে।
অর্থপাচার ও আর্থিক অনিয়ম রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এসব বিষয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়া রাজনৈতিক দলগুলোর লিখিত, সময়বদ্ধ, পরিমাপযোগ্য প্রতিশ্রুতি দরকার। শুধু প্রতিপক্ষের সমালোচনা নয়—নিজেদের করণীয় কী, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন উৎসবের মতো হওয়ার কথা—ভয় আর উত্তেজনার নয়। আমরা এমন একটি পরিবেশ চাই, যেখানে ভোটার কেন্দ্রে যাবে নির্ভয়ে, প্রার্থীরা কথা বলবেন শালীনভাবে, আর বিতর্ক হবে তথ্য ও নীতির ভিত্তিতে।
কাদা ছোড়াছুড়ি থামিয়ে এখন সময় কাজের কথা বলার। কারণ ভোটার এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন—আর তারা পরিকল্পনাই দেখতে চায়, প্রতিশোধ নয়।
লেখক: সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


