অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংঘটিত সম্ভাব্য দুর্নীতি ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখতে ট্রানজিশন টিম বা উত্তরণকালীন দল গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সম্পাদিত বিদেশি ক্রয় ও চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনার অনুরোধও জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু : অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার কোনো ধরনের দুর্নীতিতে জড়িত ছিল কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য একটি ট্রানজিশন টিম গঠন করা জরুরি। এ টিম প্রাথমিকভাবে বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করতে পারে, যার ভিত্তিতে সরকারের অন্যান্য রাষ্ট্রযন্ত্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনকেও যুক্ত করা যেতে পারে।’
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের ট্রানজিশন টিম সাধারণত দুই ধরনের সদস্য নিয়ে গঠিত হয়-সরকারের ভিতরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ দ্বারা। প্রয়োজনে এ টিম ফরেনসিক তদন্ত পরিচালনা করতেও সক্ষম হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সম্পাদিত বিভিন্ন ক্রয় চুক্তি ও বৈদেশিক চুক্তিও পুনরায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে এসব চুক্তিতে কোনো ধরনের ব্যত্যয় বা অনিয়ম হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হবে।’
তিনি উল্লেখ করেন, বিগত সরকার বিদায়ের আগে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে একাধিক বৈদেশিক চুক্তি করেছে, যা শুধু বন্দর ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতেও বিস্তৃত।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এসব চুক্তির অনেক বিষয় এখনো জনসমক্ষে পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। ফলে নতুন সরকারের ওপর কী ধরনের দায় ও দায়িত্ব বর্তাচ্ছে, তা বোঝার জন্য চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা জরুরি।’
নতুন সরকার যেহেতু এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পুনর্মূল্যায়নে আগ্রহী, তাই সংশ্লিষ্ট বৈদেশিক চুক্তিগুলোকেও একই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা উচিত বলে তিনি মত দেন।
ট্রানজিশন টিমের কাজের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এই দল যদি ফরেনসিক তদন্ত সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারের জন্য অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে। কারণ এর ভিত্তিতেই একটি ব্লু বুক তৈরি করা সম্ভব হবে। ওই ব্লু বুকের মাধ্যমে সরকারের দায়-দেনা, বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় প্রাথমিক ও পরবর্তী ধাপে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হবে।’
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘সাধারণত বিদেশে মন্ত্রিসভা গঠনের আগেই এ ধরনের কাজ শুরু করা হয়।’ তাঁর মতে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব এবং সেটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সময়সীমা।
চলতি অর্থবছরের জন্য বাস্তবসম্মত সংশোধিত বাজেটের আহ্বান : ক্রমবর্ধমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় চলতি অর্থবছরের জন্য দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত সংশোধিত বাজেট প্রণয়ন এবং কঠোর বাজেট-শৃঙ্খলা কার্যকরের আহ্বান জানিয়েছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।
নতুন সরকারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস না করার ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি। অনুষ্ঠানে নতুন সরকারের জন্য সামষ্টিক অর্থনীতির বেঞ্চমার্ক শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সিপিডির আরেক সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে অর্থনীতিতে তিনটি ‘বাধ্যতামূলক সংকট’ একসঙ্গে কাজ করছে-নাজুক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এবং সংকুচিত রাজস্ব ও ব্যয়ের পরিসর।
এ বাস্তবতায় ২০২৫ অর্থবছরের জন্য সংশোধিত বাজেটে ঋণচাপসহ সব সূচকের হালনাগাদ ও বাস্তবসম্মত পূর্বাভাস অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ের জন্য ‘মিতব্যয়ী নীতি’ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় হ্রাস এবং সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর জন্য অতিরিক্ত সরকারি অর্থ বরাদ্দ থেকে বিরত থাকা।
নতুন সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্প আপাতত স্থগিত রেখে চলমান ও বৈদেশিক ঋণনির্ভর প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহার বিশ্লেষণ করে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম জানায়, ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেওয়ার মতো লক্ষ্যগুলো অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
সংগঠনটি প্রস্তাব করেছে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া উচিত। উচ্চ ব্যয়সাপেক্ষ প্রতিশ্রুতিগুলো ২০২৭ অর্থবছর বা তার পর শুরু করা যেতে পারে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কিছু লক্ষ্য পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শুরুতেই সঠিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করতে পারলে সাফল্যের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায় এবং বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাই সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


