আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বৈবাহিক জীবনে নারী-পুরুষের সম্পর্ক নির্ভর করে অনেক বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সমঝোতা এবং দায়বদ্ধতা অন্যতম প্রধান বিষয়। বৈবাহিক জীবনে বিচ্ছেদের হার প্রসঙ্গে নানান সমীক্ষা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি-র একটি সমীক্ষার ফলাফল ভারতের পক্ষে ভরসার কথা হতে পারত। ওই সমীক্ষা অনুসারে, পৃথিবীর অন্য দেশগুলির তুলনায় ভারতে বিবাহবিচ্ছেদের হার সর্বনিম্ন। প্রতি এক হাজার বিয়ের মধ্যে ১৩টি বিয়ের পরিণাম বিবাহবিচ্ছেদ। বাকি ক্ষেত্রে বিয়ে টিকে থাকছে। ভারতের মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক এগারো শতাংশ নাগরিক বিবাহবিচ্ছিন্ন।

সমীক্ষা যাই-ই বলুক না কেন, পিতৃতান্ত্রিক ভারতীয় সমাজে মহিলাদের প্রতি বঞ্চনা আজও চিন্তার বিষয়। বৈবাহিক জীবনেও মহিলারা লাগাতার পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকারগুলি এবং স্বেচ্ছাসেবীরা।

প্রাসঙ্গিকভাবে আরও কিছু প্রশ্নও উঠছে। বিবাহবিচ্ছেদ হ্রাসের নিরিখে সারা পৃথিবীর চেয়ে ভারতের সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক ফলাফল সত্যিই কি শুভ লক্ষণ? একই ছাদের নিচে বিবাহিত নারী-পুরুষ কি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুখে দিনযাপন করছেন? নাকি বিবাহবিচ্ছেদকে যেহেতু আজও ভারতীয় সমাজে বাঁকা চোখে দেখা হয়, সেকারণে মনের অমিল হলেও মেনে নিচ্ছেন দম্পতিরা? বিশেষত মেয়েরা।

বিবাহবিচ্ছেদের পরে ভারতীয় সমাজে মহিলারা নানা ধরনের বিপদে পড়েন। এদেশে বিয়ে করতে হলে সামাজিক অনুষ্ঠান পালন করাও ব্যয়বহুল। এরপর যদি সেই বিয়ে ব্যর্থতা-বিচ্ছেদে পর্যবসিত হয়, অভিভাবকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ তাতে বাড়েই। স্বেচ্ছাসেবীদের মতে, এজন্য অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতন সয়েও মহিলারা সহজে বিয়েটা ভাঙতে চাইছেন না। তবে বিয়ে না ভাঙলেও পরিবারের অন্দরে অশান্তি কমছে না। উপরন্তু বাড়ছে। আর মধুর দাম্পত্য তিক্ততায় পর্যবসিত হচ্ছে।

বিবাহবিচ্ছিন্ন মহিলারা অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক পরিসরে, এমনকী, পরিবারে এবং বন্ধুবান্ধবদের কাছেও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। একারণে যতই অশান্তি চলুক, দাম্পত্য সম্পর্ক ‘যা আছে তাই থাক’ মেনে নিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলছেন বহু মহিলাই। পিতৃতান্ত্রিক নিগড়ে আবদ্ধ ভারতে কেন বিবাহবিচ্ছেদের হার কম, এর কারণ নিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। আশাপ্রদ তেমন কোনও তথ্য মেলেনি। বরং দেখা গিয়েছে, সন্তানের ভরণপোষণ, পারিবারিক সমর্থন না পাওয়া অথবা সমাজ বাঁকা কথা বলবে, এইসব নানা কারণে মেয়েরা চট করে বিবাহবিচ্ছেদের পথে হাঁটছেন না। মেনে এবং মানিয়ে নিচ্ছেন। না হলে বিবাহবিচ্ছেদের হারের ক্ষেত্রে ভারত তালিকায় সর্বনিম্ন থাকার সমীক্ষালব্ধ ফলাফল দেশের পক্ষে অতীব শুভ খবর হতে পারত। আসলে একেই বলে, বিধি বাম!

ভারত
প্রতীকী ছবি
Advertisement

প্রতি এক হাজার বিয়ের মধ্যে ১৩টি ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের যে ঘটনাগুলি ঘটছে, সেই সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুসারে, স্বামীর আচরণের বিরুদ্ধে প্রথমে অভিযোগ তুলছেন স্ত্রী-ই। এদেশের মেয়েরা শিক্ষাদীক্ষায় পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছেন। মহিলাদের মধ্যে একাংশ এখন শিক্ষিত ও স্ব-নির্ভরও। সমাজের এই শ্রেণির মহিলারা শহরাঞ্চল অথবা শহর-সংলগ্ন এলাকাগুলির বাসিন্দা। এই এলাকাগুলিতেই সর্বাধিক বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে গ্রামাঞ্চলের তুলনায়। তাছাড়া বিবাহবিচ্ছেদের আগে-পরে অনেক মহিলার মানসিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি হচ্ছে। এদিকে অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে মহিলারা পুরুষ সঙ্গীটিকে ত্যাগ করা ছাড়া অন্য কোনও উপায়ও দেখছেন না।

কোন পরিস্থিতিতে বিবাহিত নারী-পুরুষের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা নিয়ে কাজ করেছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। এ-ব্যাপারে ভারতে চলা প্রত্যেক সমীক্ষাতেই মোটামুটিভাবে একই ধরনের কারণ উঠে এসেছে। একনজরে দেখে নেওয়া যাক, আধুনিকতার এই ঢক্কানিনাদ এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রবল অগ্রগতির যুগে কেমন আছেন বিবাহিত ভারতীয় মহিলা সমাজ।

একেবারেই ভালো নেই। সমীক্ষা জানাচ্ছে, ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে স্ত্রী প্রায়ই স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিয়ের পর স্ত্রীকে মারধর করাটা পুরুষের কাছে ভারতে এখনও জলভাত। অন্যদিকে, এদেশের নাগরিক ৫০ শতাংশ পুরুষ বিয়ের পরেও তাঁদের বাবা-মায়ের সঙ্গেই থাকেন। অনেক সময়ই দেখা যাচ্ছে, ছেলের বউয়ের সঙ্গে শ্বশুর-শাশুড়ির সম্পর্ক নানা কারণে খারাপ হচ্ছে। অন্যতম প্ৰধান কারণ শ্বশুরবাড়িতে ছেলের বউয়ের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছেন ওঁরা।

ভারতে বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত মামলায় কয়েক বছর আগে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মন্তব্য স্মরণীয়। বিচারপতিরা বলেছিলেন, বিবাহবিচ্ছেদ আটকাতে সুপ্রিম কোর্ট কি বেডরুমে ক্যামেরা লাগানোর ব্যবস্থা করবে? সে তো অসম্ভব। সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ অতি স‌ংগত। কারণ দেখা যাচ্ছে, পুরুষরা বেডরুমেও বিবাহিত স্ত্রীর প্রতি এমন আচরণ করছেন, যেন স্ত্রী তাঁর কেনা দাসী। অনেক ক্ষেত্রে আবার বিবাহিত নারী-পুরুষের জীবনে পরকীয়া প্রেম ঢুকে পড়ায় বিবাহবিচ্ছেদ ঘটছে। বিবাহবিচ্ছেদের আরেক কারণ, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক সম্পর্ক গড়ে না ওঠা। এছাড়া যৌন হতাশার কারণেও বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।

একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, ভারতীয় সমাজে বিবাহবিচ্ছেদের যে ঘটনাগুলি ঘটছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েটি মা হয়ে যাওয়ার পরেই। এতে বিবাহবিচ্ছিন্না ওই মহিলার জীবনে চাপও যে বাড়ছে, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

স্বেচ্ছাসেবীদের মতে, বিবাহবিচ্ছেদ হতেই পারে। তাতে জীবন সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ফের জীবনের নিয়মেই জীবন নতুন পথে এগিয়ে চলবে। তিক্ততার স্বাদ পেলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদের পরে মিলে যাচ্ছে সুখী জীবনযাপন করার মতো আরেকজন সঙ্গী।

আন্তর্জাতিক সমীক্ষাগুলিতে এও দেখা যাচ্ছে, ভারতের বাসিন্দা পুরুষদের ৭৩ শতাংশ প্রেম করে বিয়ে করায় আস্থাশীল নন। তাঁরা সম্বন্ধ করে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে ইচ্ছুক। এতে মূল অসুবিধা হলো, নারী-পুরুষের পরস্পরকে আগেভাগে জানাবোঝার তেমন কোনও সুযোগও থাকছে না।

ভারতের বিবাহবিচ্ছেদের হার ১ শতাংশ। এছাড়া দুনিয়ার অন্য কিছু দেশে বিবাহবিচ্ছেদের হার সম্পর্কিত তথ্য দেখে নেওয়া যাক। যেমন, চিলিতে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৩ শতাংশ, কলম্বিয়ায় ৯ শতাংশ, মেক্সিকোতে ১৫ শতাংশ, তুরস্কে ২২ শতাংশ। এই দেশগুলিতে বিবাহবিচ্ছেদের হার তুলনায় কম বিশ্বের অন্য কিছু দেশের তুলনায়। যেমন, লুক্সেমবার্গে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৮৭ শতাংশ, স্পেনে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৬৫ শতাংশ, ফ্রান্সে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৫৫ শতাংশ, রাশিয়ায় ৫১ শতাংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৪৬ শতাংশ।

সমীক্ষকরা জানাচ্ছেন, বিবাহবিচ্ছেদের হারের নিরিখে ভারত তালিকার সর্বনিম্ন দেশ হলেও গত দু’দশকে এদেশে বিবাহিত নারী-পুরুষের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়েছে।

মাঝ রাস্তায় প্রকাশ্যে প্রেমিকার পা ধরে বসে পড়লেন প্রেমিক

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Sibbir Osman is a professional journalist currently serving as the Sub-Editor at Zoom Bangla News. Known for his strong editorial skills and insightful writing, he has established himself as a dedicated and articulate voice in the field of journalism.