Advertisement

ধর্ম ডেস্ক : মানুষ যখন দাম্পত্য জীবন শুরু করে, এই শুরুর একটি পূর্ণতার নাম হলো শিশু। শিশু জন্মের মাধ্যমেই মূলত সাংসারিক জীবনের মূলসূচনা।একজন মানুষ সুন্দর চরিত্র সুস্বাস্থ্য, উন্নত মেধা ও মননের অধিকারী হওয়ার জন্য শিশুকাল থেকেই তার পরিচর্যা হতে হয় সুন্দর ও আইনত।

শিশুকালের পরিচর্যার জন্য সকল ধর্মে সকল মতবাদে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের গর্বের ধন ইসলাম দিয়েছে সর্বাধুনিক বিধিবিধান। প্রথমত আল্লাহ এই সন্তান দিয়ে দাম্পত্য জীবনকে করেছেন রূপময় ও প্রোজ্জ্বল। সন্তান জন্মদানের মধ্য দিয়ে নারী তার নারীত্ব ও পুরুষ তার পুরুষত্ব বিশ্বকে জানান দিল।

দেখুন আল্লাহর ঘোষণা কত সুন্দর, وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا وَجَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ بَنِينَ وَحَفَدَةً وَرَزَقَكُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ

অর্থাৎ: ‘আল্লাহ তোমাদের থেকে তোমাদের স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রী থেকে পুত্র প্রোপৌত্র সৃষ্টি করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে ভাল রিজিকের ব্যবস্থা করছেন। (সূরা: আননাহল : আয়াত: ৭২)।

আমাদের ইসলামের দর্শন হলো সন্তান হওয়ার পর পিতা-মাতার শোকরিয়া আদায় করা। শিশুসন্তান পরিচর্যার ব্যাপারে আগ থেকেই ভালভাবে সবকিছু জেনে নেয়া। শিশুর শরীর গঠনের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন পড়বে খাদ্যের। সেই খাদ্যগুলো হতে হবে হালাল ও শতভাগ নিশ্চিত জায়েজ। ইসলাম বলে হারামের খাদ্যে বেড়ে ওঠা শরীর আগুনে জ্বলবে। আজকাল অনেক মা এমন আছেন যারা নিজের বুকে দুধ পান করাতে চান না। কারণ হিসেব শরীর চেহারা বডিফিগার নষ্ট হওয়ার অযুহাত দেখায়। এটা কখনো ঠিক না। একজন শিশুর সুস্থ সুন্দর হয়ে বেড়ে ওঠার জন্য মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই।

বুকের দুধ পান করালে চেহারা অবয়ব নষ্ট হওয়ার কথা বলে পাশ্চাত্যের সমাজের মানুষ। যে সব শিশুদের মায়ের দুধের পরিবর্তে শুধুমাত্র পাউটার বা গরু ছাগল মহিষের দুধ পান করানো হয়, ওই সকল শিশু পরবর্তী জীবনে মেধাহীন হয়। মেধা ও বুদ্ধিমান হতে হলে মায়ের দুধের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে ইমাম গাজ্জালী (রহ.) এর কথাটি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

তিনি বলেন, ‘ধার্মিক নয় এবং হালাল খাদ্য ভক্ষণকারী নয়, এমন কোনো নারীকে যেন শিশুর লালনপালন ও দুধপানের দায়িত্ব দেয়া না হয়। কারণ হারাম দুধের মধ্যে কোনো বরকত থাকে না। সুতরাং এর থেকে শিশুর যে শারীরিক বিকাশ ঘটবে; সেটা হবে দুষ্টমূল থেকে তার গঠন। তখন তার স্বভাব দুষ্টুমি ও অপবিত্র বিষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়বে।’ সুতরাং শিশুর খাদ্য ও তার বেড়ে ওঠা সকল ক্ষেত্রে হারামের সংমিশ্রণ থেকে রক্ষা করতে হবে।

এভাবে যখন শিশুটি বাড়তে থাকবে তখন তাকে শিক্ষার দিতে হবে ভালো কিছুর। তার প্রথম শিক্ষা ও শিক্ষক হলো দুধপানকারিনী মা। মা যদি ইসলাম ও সুন্নার আলোকে আলোকিত মানুষ হন, ঈমানের ভূষণে সাজসাজ রব থাকে হৃদয়ের অলিন্দ, মুসলমানিত্ব বজায় থাকে সকল আচার আচরণ বিচার বিচরণ; তাহলে তার কাছে লালিত পালিত শিশুটিও সুন্দর মন ও আলোকিত মানুষ হবে। ঈমানের সাজে সাজবে তার কচিমন ও মানসিকতা।

এই সময় ইসলামের নির্দেশনা হলো শিশুর বাড়ন্তকে আঘাত করে এমন কোনো ওষুধ ও খানাখাদ্য গ্রহণ করা যাবে না। শিশুর পেছনে যথেচ্ছা সময় দিতে হবে। মা-বাবার পূর্ণ মনোযোগ থাকতে হবে শিশুর প্রতি। তাকে সামনে নিয়ে টিভি নাটক মোবাইল ও ঝগড়াঝাটি করা যাবে না। এই সময় যত বেশি পারা যায় শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য দোয়া ও ফিকির করা। এক জরিপে দেখা গেছে এই সময় মা-বাবার অসচেতনা অসতর্কতা ও অমনোযোগের ২৪% শিশু মৃত্যুবরণ করে।

‘প্রতিটি নবজাতক স্বভাবজাত ধর্ম ইসলামের ওপর ভূমিষ্ঠ হয় ও তার কথা ফোটা পর্যন্ত এ অবস্থার ওপর সে প্রতিষ্ঠিত থাকে। অতঃপর তার মা-বাবা তাকে ইহুদি অথবা খ্রিষ্টান বানায়।’ অন্য এক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন- তোমরা সন্তানদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো এবং সদাচরণ ও শিষ্টাচার শিক্ষা দাও (তিরমিজি)। মা-বাবাকে একথা মনে রাখতে হবে; আপনার সন্তান কিন্তু আপনার কাছে আল্লাহ বিরাট এক আমানত। এই আমানত আপনি কীভাবে রক্ষা করবেন এটা আপনার বিষয়। যদি চান আপনি তাকে পাশ্চাত্যের সাজে সাজাবেন, পারবেন। কিন্তু আল্লাহর দরবারে কঠিন জবাবদিহিতার মুখোমুখী দাঁড়াতে হবে।

ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেন, ‘শিশু হচ্ছে মা-বাবার নিকট আল্লাহ প্রদত্ত একটি আমানত। তার পবিত্র আত্মা এখন যেকোনো ছবি ও অঙ্কন থেকে মুক্ত। নির্মল ও উৎকৃষ্ট একটি ও অঙ্কনযোগ্য একটি উর্বরভূমি। সেখানে যা অংকিত হবে তাই সে গ্রহণ করবে। যেদিকে তাকে আকৃষ্ট করানো হবে সেদিকেই সে ধাবমান হবে।

হাদিস শরিফে রাসূল (সা.) বলেন- তোমাদের সন্তানদের উত্তমরূপে জ্ঞান দান করো, কেননা তারা তোমাদের পরবর্তী যুগের জন্য সৃষ্ট (মুসলিম)। সুতরাং যদি কল্যাণকর বিষয় বা শিষ্টাচার শিক্ষা ও এর ওপর তাকে অভ্যস্ত করা হয়; তাহলে এভাবেই সে গড়ে উঠবে। সৌভাগ্য তার পদচুম্বন করবে ইহ ও পরলোকে। সে সফলতা ও পুরস্কারের অংশীদার হবে তার মা-বাবা এমনকী শিক্ষকরাও। পক্ষান্তর যদি তাকে আল্লাহ না করুন, চতুষ্পদ জন্তুর মতো ছেড়ে দিয়ে অকল্যাণ ও মন্দের ওপর অভ্যস্ত করা হয়, তাহলে সে হবে ব্যর্থমনোরথ ও হতভাগ্য। তখন এর দায়ভার সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবকদের কাঁধে গিয়ে পড়বে।

মা-বাব বা অভিভাবকদের বুঝতে হবে শিশুকাল স্থায়ী কোনো কাল না। অল্প একটু সময়। এই সময়টাতে তার পাশে থাকুন। সভ্যতার সকল উপকরণগুলো তার সামনে স্পষ্ট করুন। তার সঙ্গে খেলা করুন ভদ্রভাবে ভদ্রভাষায় ভদ্র উপায় উপকরণে। অনেক পরিবারে দেখা যায় স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া শিশু ও অবুঝ ছেলে-মেয়ের সামনে। এর থেকে তারা কী শিখবে? আমার এক আত্মীয় তারা পরস্পরকে কুত্তার বাচ্চা বলে গালি দিত। তাদের অবুঝ শিশুটি যেদিন থেকে অস্ফুট শব্দের কথা বলা শুরু করল, তখন তার মুখ থেকে ওই বকা বের হলো। আল্লাহ মুমিনদের লক্ষ করে বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং পরিবার পরিজনকে জাহান্নামের অগ্নি থেকে বাঁচাও। আপনি আপনার সন্তানকে কখন বাঁচাবেন? যখন সে বড় হবে। বিবাহশাদি করবে তখন? না, তাকে শিশুকাল থেকেই বাঁচাতে হবে। শিশুকালেই তাকে ভালোমন্দ বুঝাতে হবে।

শিশুকালের পর আসে কিশোরকাল। বর্তমান কিশোরদের নিয়ে বিপাকে আছেন মা-বাবা অভিভাবক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। কোনোভাবেই তাদের আগলে রাখা যাচ্ছে না। চুপে চুপে তারা হয়ে ওঠছে সন্ত্রাসী, চোরা কারবারি। এখন নিয়মিত তাদের নিয়ে পত্রিকায় খবর হয়, কলাম হয়। কিশোর বয়সটাতে তাকে ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনের ভেতরে রাখতে হবে। বাহিরের বখাটে ছেলেদের সঙ্গে মিশতে দেয়া যাবে না। স্কুল বাসা বাবা-মা ভাই-বোন ছাড়া অন্যকোনো ব্যস্ততা তার থাকতে পারবে না। তার আসা যাওয়া ঘুরাফেরা সবকিছুতে রাখতে হবে কড়ানজর।

তবে আবার শাসনের নামে সীমাতিরিক্ত কিছু করা যাবে না, তাহলে হিতে বিপরীত হবে। নজর রাখতে হবে সে যেন ভিডিও গেমস স্মার্টফোন ট্যাপে সারাক্ষণ ব্যস্ত না থাকে। এই বয়সটা হলো গড়ার বয়স। এই সময় তার মেজায ও মেধার মধ্যে যা গেঁথে যাবে সারাজীবন এই চিন্তা নিয়েই তার চলতে হবে। তার অনাগত জীবনকে সুন্দর সুশৃঙ্খল করার জন্য বাবা-মাকে মেহনত করতে হবে। চারিত্রিক বিষয়গুলো, মেজাযের বিষয়গুলোও খেয়াল রাখতে হবে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর প্রসিদ্ধ হাদিস ‘তোমরা প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)। অভিভাবক যদি তাকে ইসলামি শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলে এর দ্বারা ভবিষ্যত জীবনে কখনো দেশ বিরোধী নেশাজাতীয় কোনো কাজ সংঘটিত হবে না।

অভিভাবকের করণীয় কী সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সাহাবি হজরত কাতাদাহ (রাযি.) বলেন, ‘অভিভাবক তাদের রক্ষা করবে, তাদের আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশ করবে, তার নাফরমানি থেকে নিবৃত করবে এবং আল্লাহর নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব নেবে, আল্লাহর আদেশ পালনের নির্দেশ প্রদান ও তাতে সহযোগিতা করবে। যখনই আল্লাহর কোনো নাফরমানি গোচরে আসবে তাদের তা হতে ফিরিয়ে রাখবে।’ অভিভাবকদের লক্ষ করে ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘তাদের সৎ কাজের আদেশ কর, অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখ আর অযথা কাজে ছেড়ে দিও না। তাহলে কিয়ামত দিবসে অগ্নি তাদের গ্রাস করে ফেলবে।’ শিশুকালের পর কিশোর বয়স থেকেই তাকে নামাজের পাবন্দ করাও।

হাদিস শরিফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সন্তানের বয়স সাত বছর হলে নামাজ শিক্ষা দাও! ও বয়স দশ বছর হলে নামাজের জন্য তাকে প্রহার কর।’ যে কিশোর বয়সে নামাজি সে কি আর সন্ত্রাসী হতে পারে? দেশবিরোধী সমাজ বিরোধী কাজে শরিক হতে পারে? পারে না। আমাদের সবার উচিত শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরির লক্ষ্যে ইসলামি অনুশাসন মেনে চলা এবং শিশুদের ইসলামি মানসিকতায় গড়ে তোলা।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইসলামি অনুশাসন মতো আমাদের শিশুদের পরিচর্যা করার তাওফিক দান করুন। আমিন। সূত্র: ডেইলি বাংলাদেশ

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saiful Islam is a journalist at Zoom Bangla News with seven years of experience in news writing and editorial work. He contributes to producing accurate, well-structured, and reader-focused content across digital platforms. His work reflects a strong commitment to editorial standards and responsible journalism.