আন্তর্জাতিক ডেস্ক : রেহানার বয়স তখন ১৪ বছর। ৪ বোনের মধ্যে সে বড়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ২০০৪ সালে মা-বাবা তাঁর বিয়ে দেন। পাত্র দুবাই থেকে আসা ৫৫ বছর বয়সী এক ধনী শেখ। ভেবেছিলেন, হয়তো ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাবে। কিন্তু বিধিবাম। বিয়ের এক মাস পরই রেহানাকে রেলস্টেশনে ফেলে যান ওই শেখ। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাড়ি ফিরতে হয় তাঁকে।

eagle

Advertisement

ভারতে হায়দরাবাদের নাশিমান নগরের রেহানার মতো সেখানকার অনেক কিশোরীর জীবনেই ঘটছে এমন দুর্বিষহ ঘটনা। বিত্তশালী ও বৃদ্ধ আরব শেখরা কিশোরী বউয়ের খোঁজে হায়দরাবাদকেই বেছে নিয়েছেন। এখানে তাঁরা অর্থের বিনিময়ে চুক্তিতে কিশোরীদের বিয়ে করেন। যৌন চাহিদা শেষ হলেই ফিরিয়ে দেন তাদের।

হায়দরাবাদের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মুখপাত্র সুলতানা বলেন, বিপুল অর্থের বিনিময়ে অটোরিকশার চালক বাবা সিরাজ উদ্দিন ওই শেখের সঙ্গে তাঁর মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দুবাই থেকে আসা বৃদ্ধ ওই আরব শেখের সঙ্গে বিয়ের পর রেহানার জীবনে একের পর এক নেমে আসে আরও করুণ পরিণতি। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাড়ি ফেরার কিছুদিন পরই মা-বাবা কাতারের এক শেখের সঙ্গে আবার তাঁর বিয়ে দেন। এবার এই পাত্রের বয়স ৭০। আবার স্বামীর সঙ্গে সংসার করার স্বপ্নে বিভোর হন রেহানা। তাঁকে নিয়ে কাতারে উড়াল দেন ওই শেখ। কিন্তু এবারও স্বপ্ন ভঙ্গ। কাতারে গিয়ে কয়েক মাসের মাথায় অন্য এক শেখের কাছে রেহানাকে বিক্রি করে দেন তাঁর স্বামী। এরপর গত চার বছরে আরও ১৪ জন শেখের কাছে তাঁকে বিক্রি করা হয়।

এসব ঘটনায় একবার রাগে-অভিমানে মা মইন বেগমের মোবাইল ফোনে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন রেহানা। ওই বার্তায় তিনি বলেছিলেন, ‘অভিনন্দন আম্মি, আপনি আপনার মেয়ের জন্য ১৭তম জামাই পেলেন।’

রেহানার এই দুর্বিষহ জীবনের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত চার দশকে শুধু যৌন চাহিদা মেটানোর জন্য হায়দরাবাদের হাজারো কিশোরী আরব শেখদের চুক্তিভিত্তিক স্ত্রী হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা বিত্তশালী শেখরা অর্থের বিনিময়ে চুক্তিতে তাদের কিনে নেন। শেখদের যৌন চাহিদা মিটে গেলে কিশোরীদের ফেরত দিতেন তাঁরা। কিন্তু সম্প্রতি অনেক মেয়ে শেখদের কাছে প্রতারিত হয়ে ফিরে এসে অভিযোগ দায়ের করায় বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। নড়ে বসেছে প্রশাসনও।

হায়দরাবাদের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা শাহীনের মতো আরও কয়েকটি সংস্থা এখন সোচ্চার হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে পুলিশকে সহায়তা করছে সংস্থাগুলো।

শাহীনের চেয়ারপারসন জামিলা নিশাত বলেন, ‘আগে এ ধরনের বাল্যবিবাহের কোনো তথ্য ছিল না। গত ১০ বছরে আমরা এ ধরনের প্রায় ৫০০টি ঘটনার তথ্য পেয়েছি। কিন্তু আমাদের ধারণা, এই সংখ্যা আরও ১০ গুণ বেশি হবে। গত বছরেই ১০০টি ঘটনার অভিযোগ আমরা পেয়েছি।’

হায়দরাবাদ পুলিশের উপকমিশনার (সাউথ জোন) ভি সত্যনারায়ণ বলেন, ‘২০১০ থেকে এ ধরনের মাত্র ৯টি মামলা নিবন্ধিত হয়েছে। উন্নয়ন সংস্থা, মানবাধিকার কর্মী ও পুলিশের উদ্যোগে এখন এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার মেয়েরা পুলিশের কাছে অভিযোগ নিয়ে আসা শুরু করেছে।’

গত কয়েক সপ্তাহে পুলিশ এসব ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যারা আরব শেখদের হায়দরাবাদে সহায়তা করছে, দালাল ও যেসব কাজি অর্থের বিনিময়ে কিশোরীদের বিয়ে দিচ্ছেন, তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। গত ২০ সেপ্টেম্বর পুলিশ অভিযান চালিয়ে কাতারের আটজন শেখ, একজন কাজি ও একটি হোটেলের মালিককে গ্রেপ্তার করে। এর এক সপ্তাহ পর হায়দরাবাদের প্রধান কাজিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর নির্দেশেই বিয়ে পড়ানো হয় বলে অভিযোগ।

শেখদের বউবাজার : চার দশক ধরে এই হায়দরাবাদ আরব শেখদের বউবাজারে পরিণত হয়েছে। তাঁরা কুমারী ও কিশোরীদের খোঁজে এখানে আসেন। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী কুমারী মেয়ে তাঁদের পছন্দ। দরিদ্র মুসলিম পরিবারের অভিভাবকেরা বিপুল অর্থের লোভে নিজের মেয়েকে কথিত বিয়ে দিয়ে শেখদের যৌন চাহিদা মেটাতে তাঁদের হাতে তুলে দেন।

দেশটির কলাম লেখক ও বুদ্ধিজীবী মীর আইয়ুব আলী খান বলেন, এই পুরোনো শহরটির সঙ্গে আরব শেখদের বহু বছর থেকেই সম্পর্ক রয়েছে। ইয়েমেনের অনেক নাগরিক বারকাস এলাকায় বসবাস করেন। তাঁদের মাধ্যমেই আরব শেখরা হায়দরাবাদের মেয়েদের বিয়ে করতে আসছেন। আর পরিবারের অভাব-অনটনের কারণেই আরব শেখদের হাতে মেয়েকে তুলে দিচ্ছেন মা-বাবা।

জামিলা নিশাত বলেন, ‘শেখরা মূলত দেখতে সুন্দর ও আকর্ষণীয় শারীরিক গড়নের কারণেই হায়দরাবাদের মেয়েদের পছন্দ করেন। তাঁরা এসব মেয়ে নিয়ে গৃহস্থালির কাজ করান। অনেক মা-বাবাই অল্প বয়সে শেখের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে চান। কারণ, তাঁদের ধারণা মেয়ের ঋতুচক্র আসার পর বাড়িতে থাকাটা পাপ।’

পুলিশ জানায়, হায়দরাবাদে কিশোরী মেয়ের খোঁজে বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, কুয়েত, ওমান, সুদান ও সোমালিয়ার শেখরাই আসেন।

পুলিশের উপকমিশনার সত্যনারায়ণ বলেন, শেখরা পর্যটন ভিসা ও কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা ভিসা নিয়ে হায়দরাবাদে আসেন। যাঁরা আসেন তাঁদের সবাই বিত্তশালী নন। কেউ কেউ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারেরও আছেন।

আরব শেখরা পছন্দ করা মাত্রই দ্রুত ওই কিশোরীর সঙ্গে বিয়ের আয়োজন করেন। বিনিময়ে তাঁরা কিশোরীর পরিবারকে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ রুপি পর্যন্ত দেন। এ ছাড়া সুন্দর পোশাক, সোনা ও কখনো বাড়ি পর্যন্ত দিয়ে দেন। এসব অর্থ কিশোরীর পরিবার, দালাল ও কাজি বাঁটোয়ারা করে নেন।

শাহীনের চেয়ারপারসন জামিলা নিশাত বলেন, ‘অনেক সময় কিশোরীর পরিবার যে অর্থ পায় তা অনেক কম। কিন্তু তারপরও তাঁরা খুশি যে, মেয়ের বিয়েতে তাঁদের কোনো খরচ করতে হলো না।’

১২ বছর বয়সে বছর ৭০-এর দুবাই থেকে আসা এক শেখের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল ওয়াসিমের। তাঁর বয়স এখন ২৭। তিনি বলেন, ‘বিয়ে ও যৌনতা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু আমাকে ওই শেখের সঙ্গে তা করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এক সপ্তাহের মধ্যে আমি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ি। এরপর মালামাল আনার জন্য দুবাই গেলে তিনি আর ফিরে আসেননি। আমার একটি মেয়ে হয়েছে। এখন আমি সেলাইয়ের কাজ করি।’

একই ঘটনা ঘটেছে মঙ্গলাঘাট এলাকার মুনীরা ফাতেমার (১৮) জীবনে। ২০১১ সালে সৎবাবা তাঁকে ওমানের ৭৫ বছর বয়সী এক বুড়ো শেখের সঙ্গে বিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘ওই ব্যক্তি আমাকে একটি অবকাশকেন্দ্রে নিয়ে দুই মাস ছিলেন। এটি আমার বাড়ি থেকে একটু দূরে। জোর করে প্রতিদিন তিনি আমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতেন। আমি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে তিনি বিয়ের সব কাগজপত্র নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে সেখান থেকে টেলিফোনে তিনি আমাকে তিন তালাক দেন।’

এমন পোশাক পরেন কীভাবে, এ যেন রুচির দুর্ভিক্ষ

বর্তমানে উন্নয়ন সংস্থাগুলো মেয়েদের শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। পুলিশও দালাল-কাজি ও আরব শেখদের কিশোরী মেয়েদের কেনা–বেচার চক্রটি ধরতে তৎপর হয়েছে।

হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও এনডিটিভি অবলম্বনে আবু হেনা মোস্তফা কামাল

উৎস: হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও এনডিটিভি ও প্রথম আলো।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Tarek Hasan is a professional journalist and currently works as a sub-editor at Zoom Bangla News. With six years of experience in journalism, he is an experienced writer with a strong focus on accuracy, clarity, and editorial quality. His work contributes to delivering reliable and engaging news content to digital audiences.