Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পিতার ইচ্ছানুযায়ী যুবক বয়স থেকেই মিসরের তানতা শহরের ছোট একটি ক্লিনিকে দরিদ্র মানুষকে ফ্রি চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন মুহাম্মদ মাশালি। যদিও তিনি কারও কাছ থেকে ফি নিতেন—সেটা মিসরীয় ১০ পাউন্ডের বেশি নয়।

আজ থেকে ৪০ বছর আগে মৃত্যুশয্যায় পিতা আব্দুল গফফার মাশালি চিকিৎসক পুত্র মুহাম্মদ মাশালিকে এই উপদেশ দেন যে, আজীবন পুত্র যেন অসহায় মানুষকে ফ্রি চিকিৎসাসেবা দিয়ে জীবনকে দরিদ্র মানুষের জন্য নিবেদন করেন। পিতার ইচ্ছানুযায়ী তিনি তা-ই করেছেন।

একসময় পর্দার আড়ালের এই মহানায়ককে মিসরের জনগণ-ই ভালোমতো চিনতো না। কিন্তু যিনি দেশের অসহায় ও অস্বচ্ছল মানুষের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে এত বড় সেবা দিলেন—মৃত্যুর আগে সৃষ্টিকর্তা তাঁকে বিশ্বব্যাপী বিপুল পরিচিতি দান করলেন। দেশ ছাপিয়ে আজ পৃথিবীর নানাপ্রান্তের মানুষের মুখেমুখে ছড়িয়ে পড়েছে মানবতার এই চিকিৎসকের নাম ও কর্মের প্রশংসা।

মুহাম্মদ মাশালি তানতায় যখন নিজ চেম্বারে বসতেন, তখন তাঁর ক্লিনিকের সামনে গরিব রোগীদের লম্বা লাইন ছিল দৈনন্দিনের চিত্র। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা রোগীরা ফ্রি কিংবা অল্প ফি-তে চিকিৎসা নিতেন। এমনকি অনেক রোগী এবং তাদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তাও দিতেন তিনি।

ড. মাশালি কেন এমন জীবন বেছে নিলেন জানতে চাইলে গণমাধ্যমকে তিনি জানান, তাঁর পরিবারও যথেষ্ঠ স্বচ্ছল ছিল না, অস্বচ্ছলতার কষ্ট তিনি বুঝতেন। সেই উপলব্ধি থেকেই অস্বচ্ছলদের সঙ্গে চলার পথ বেছে নেওয়া।

এই চিকিৎসক গত ২০ জুলাই তানতায় হঠাৎ ব্লাডপেশার হ্রাসের কারণে ইন্তেকাল করেন। ১৯৪৪ সালে জন্মগ্রহণকারী ৭৫ বছর বয়সী এই গরিবের বন্ধু পৃথিবীকে বিদায় জানালেও এখনও তাঁর মিশন অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি হুসনি কুতুব নামে মিসরীয় এক চিকিৎসক মুহাম্মদ মাশালির মিশন জারি রাখার ঘোষণা দিয়ে তাঁর মতোই ওই ক্লিনিকে ফের ফ্রি চিকিৎসাসেবা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনিও গরিব রোগীদের থেকে সর্বোচ্চ ১০ পাউন্ড ফি নেবেন।

মুহাম্মদ মাশালির পরিবারের সঙ্গে কথা বলে ইতোমধ্যেই তিনি ক্লিনিকটি খোলার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘দেশবাসীর জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, ক্লিনিকটি মুহাম্মদ মাশালির নিয়মানুযায়ী পরিচালিত হবে। যেসব রোগী একেবারেই অস্বচ্ছল তাদের থেকে আমিও কোনও ফি গ্রহণ করবো না।’

প্রসঙ্গত, ড. মাশালি ১৯৪৪ সালে মিসরের বেহিরা গভর্নোরেটে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি কায়রো ইউনিভার্সিটি থেকে মেডিক্যাল ফ্যাকালটির ওপর গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। পিতার অনুপ্রেরণায় তিনি পশ্চিম গভর্নোরেটের একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন। তিনি বলতেন, ‘আমি মূল্যবান পোশাক পরিচ্ছদ পরতে এবং দামি গাড়িতে আরোহণে আনন্দ পাই না, আমার আনন্দ গরিবের মুখে হাসি ফোঁটানোতে।’

ড. মাশালির পুত্র ওয়ালিদ মাশালি পিতার ইন্তেকালের পরে বলেন, ‘আমার পিতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ কথা বারবার বলতেন, আমি তোমাদের অসহায় ও দরিদ্র শ্রেণির সঙ্গে উত্তম আচার-ব্যবহারের উপদেশ দিচ্ছি। পিতার থেকে এও শুনেছি যে, তিনি যখন মেডিক্যালে পড়তেন, তখন তাঁর এক শিক্ষক তাঁদের এই উপদেশ দিতেন—তোমারা শহরের আয়েশি জীবন, আড়ম্বর বাড়ি-গাড়ির ইচ্ছা করো না, গ্রামে কাজ করবা, তাহলে অসহায় মানুষের দোয়া পাবা—এটিই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।’ দীর্ঘ কর্মময় জীবনে তার পিতা অসংখ্য দরিদ্র মানুষের দোয়া ও আশির্বাদ পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।

ওয়ালিদ মাশালি আরও বলেন, ‘গত রমজানেই একটি প্রকল্পের লোকজন আমার পিতাকে বড় অঙ্কের উপঢৌকনের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু তিনি তা বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দেন। তিনি তাদের বলেন, ‘পৃথিবীতে আমি কোনও বিনিময় চাই না। আমাকে আল্লাহ সাহায্য করবেন। অযোগ্য হয়েও আমি পৃথিবীতে যা পেয়েছি, তা অফুরান। আমাকে আমার স্বাভাবিক কাজ নিয়েই থাকতে দিন। আপনারা বরং এই উপহারের অর্থগুলো গৃহহীন ও অনাথ শিশু এবং অভাবী লোকদের মাঝে দান করে দিন।’

মৃত্যুর আগে এক সাক্ষাৎকারে মুহাম্মদ মাশালি বলেছিলেন, তিনি প্রতিদিন সকাল সাতটায় ক্লিনিকে যেতেন এবং মাগরিব পর্যন্ত সেখানে রোগী দেখতেন। এরপর বাসায় ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে পাশের দুটি গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে রোগীদের খোঁজ-খবর নিতেন। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ পাউন্ড নিতেন তিনি।

গত জুলাইয়ে তাঁর মৃত্যুতে বিশেষ করে আরব দেশসমূহে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহে সক্রিয়রা তার বিদায়ে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং তাঁর অনুসারীদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। মিসরের প্রখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠ আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড ইমাম শায়খ আহমাদ আত তাইয়িবও শোক জানান। তিনি বলেন, ‘মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় এই বান্দার ওপর রহম করুন এবং তাঁকে সর্বশ্রেষ্ঠ জান্নাত দান করুন। তিনি মানুষের মাঝে চিরকাল উদাহরণ হয়ে বেঁচে থাকবেন। মানুষ জানবে পৃথিবী নশ্বর হলেও মানবসেবার মাধ্যমে এখানে অবিনশ্বর হয়ে থাকা যায়।’

সূত্র: আল আরাবিয়া আরবি

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saiful Islam is a journalist at Zoom Bangla News with seven years of experience in news writing and editorial work. He contributes to producing accurate, well-structured, and reader-focused content across digital platforms. His work reflects a strong commitment to editorial standards and responsible journalism.