জাহিদ ইকবাল: দেশের জ্বালানি বাজারে যখন সরবরাহের সামান্যতম ঘাটতি নিয়ে সাধারণ মানুষ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে, ঠিক তখনই এক শ্রেণির অসাধু চক্র ব্যক্তিগত গাড়িকে (প্রাইভেট কার) ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জোগান দিচ্ছে এক ভয়াবহ তস্করবৃত্তির।

রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ও এর আশপাশে সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মূলত জ্বালানি তেল পাচার ও অবৈধ মজুদের জন্য ‘প্রাইভেট কার’ এখন প্রধান বাহনে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার তেল সরিয়ে নেওয়া হলেও স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরবতা নিয়ে জনমনে গভীর ক্ষোভ ও প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বর্তমানে সড়কে চলাচলকারী অধিকাংশ ব্যক্তিগত গাড়িই এলপিজি (LPG) অথবা সিএনজি (CNG) রূপান্তরিত। অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারদের মতে, একটি দ্বৈত জ্বালানি (Dual Fuel) চালিত গাড়িতে ইঞ্জিন স্টার্ট করা বা লুব্রিক্যান্ট সার্কুলেশন সচল রাখার জন্য মাসে সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ লিটার পেট্রোল বা অকটেনের প্রয়োজন হয়। অথচ ফিলিং স্টেশনগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিটি এলপিজি বা সিএনজি করা গাড়ি পাম্পে এসে ২০ থেকে ৩০ লিটার পর্যন্ত তেল সংগ্রহ করছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, যে গাড়িতে জ্বালানি হিসেবে গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই গাড়িতে কেন প্রতিদিন বা একদিন অন্তর এত বিপুল পরিমাণ তেল ভরা হচ্ছে?
তথ্য বলছে, এই গাড়িগুলোর ফুয়েল ট্যাঙ্কিকে মূলত ‘মোবাইল স্টোরেজ’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাম্প থেকে তেল নেওয়ার পর তা নির্জন স্থানে নিয়ে ড্রামজাত করা হচ্ছে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পরবর্তীতে কালোবাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে।
প্রশাসনের দৃষ্টির আড়ালে ‘তেল ডাকাতি’
ফিলিং স্টেশনগুলোতে আগে কখনোই ব্যক্তিগত গাড়ির এমন অস্বাভাবিক লাইন দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষ ও গাড়ি চালকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই চক্রটি এতই সুসংগঠিত যে তারা নিয়মিত বিরতিতে পাম্প পরিবর্তন করে তেল সংগ্রহ করে। অথচ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডদের পক্ষ থেকে পাম্পগুলোতে নিয়মিত তদারকি বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রশাসনের অগোচরেই গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা সাধারণ মানুষের জ্বালানি অধিকার লুণ্ঠন করছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এই পরিকল্পিত পাচার রোধে এখনই কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে:
রেশনিং সিস্টেম চালুকরণ: প্রতিটি ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য মাসে তেলের একটি নির্দিষ্ট সিলিং বা সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া। বিশেষ করে গ্যাসচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে এই সীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
ফিলিং স্টেশনে নজরদারি: পাম্পগুলোতে সিসিটিভি ফুটেজ নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং একই গাড়ি বারবার তেল নিচ্ছে কি না, তা ডিজিটাল ডেটাবেসের মাধ্যমে যাচাই করা।
পাম্প মালিকদের জবাবদিহিতা: কেন গ্যাসের গাড়িতে অস্বাভাবিক পরিমাণ তেল দেওয়া হচ্ছে, তার জন্য পাম্প কর্তৃপক্ষকে কৈফিয়তের আওতায় আনা।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান: সন্দেহজনক গাড়িগুলোতে হানা দিয়ে ফুয়েল ট্যাংক থেকে তেল ড্রামজাত করার সময় হাতেনাতে আটক করা।
আরও পড়ুনঃ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ স্কাউটসের কার্যনির্বাহী কমিটির সাক্ষাৎ
ব্যক্তিগত গাড়ির মাধ্যমে এই তেলের অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে জ্বালানি সংকট অচিরেই জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে। প্রশাসনের প্রতি জোরালো দাবি, জনস্বার্থে এবং রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ জ্বালানি রক্ষায় তারা যেন অনতিবিলম্বে এই ‘তেল ডাকাতি’ বন্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। যথাযথ তদারকি না থাকলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি শুধু বাড়বে না, বরং সরকারের জ্বালানি সাশ্রয় নীতিও মুখ থুবড়ে পড়বে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


