ইসলামের ইতিহাসে কিছু স্থান এবং ব্যক্তিত্বের মর্যাদা অনন্য। তেমনই একটি স্থান হলো জান্নাতুল বাকি কবরস্থান, এই কবরস্থানের নামকরণ করা হয়েছে সেখানে জন্মানো গারকদ গাছের নামানুসারে। এই গাছের কারণেই কবরস্থানটি পরিচিতি লাভ করে বাকি আল গারকদ নামে। ঐতিহাসিকভাবে কবরস্থানটি নগর দুর্গের বাবে জুমার ঠিক বাইরে অবস্থিত ছিল। এর পশ্চিম দিক জুড়ে ছিল বিস্তীর্ণ খেজুর বাগান, আর পূর্ব দিকে পবিত্র নগরীর সুরক্ষিত দুর্গপ্রাচীর। কবরস্থানটির দুই পাশ দিয়ে শহরের উপত্যকা ও জলধারা প্রবাহিত হতো, যা স্থানটির ভেৌগোলিক ও প্রাকৃতিক গুরুত্বকে আরও বৃদ্ধি করেছিল। ইসলামের ইতিহাসে জান্নাতুল বাকি কবরস্থান একটি বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন স্থান। এটি মুসলমানদের অন্যতম পবিত্র কবরস্থান হিসেবে স্বীকৃত।

জান্নাতুল বাকিতে সমাহিত প্রথম সাহাবি : জান্নাতুল বাকিতে সর্বপ্রথম যাকে দাফন করা হয়েছিল, তিনি হলেন সম্মানিত সাহাবি উসমান ইবনে মাজউন (রা.)। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন মুহাজিরদের মধ্যেও প্রথম ব্যক্তি, যিনি ইনে্তকাল করেন, যিনি রাসুল (সা.) এর জীবদ্দশায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরের জিলহজ মাসে ইনে্তকাল করেন। উসমান ইবনে মাজউন (রা.) ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার ও আল্লাহভীরু একজন সাহাবি। রাসুলল্লাহ (সা.) নিজে তঁার জানাজার নামাজ আদায় করে ছিলেন। বর্ণিত আছে, উসমান ইবনে মাজউন (রা.)-এর ইনে্তকালের পর রাসুল (সা.) তঁার কপালে চুম্বন করেছিলেন, এবং তার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে দেখা গিয়েছিল। এ দৃশ্য নবীজির গভীর ভালোবাসা ও মানবিক আবেগের এক হূদয়স্পর্শী প্রকাশ। এছাড়া উম্মুল আলা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি স্বপ্নে উসমান ইবনে মাজউন (রা.)-এর জন্য একটি প্রবাহমান ঝর্ণা দেখতে পান। বিষয়টি তিনি রাসুল (সা.)-কে জানালে নবীজি (সা.) বলেন∏এই ঝর্ণা তঁার জন্য প্রবাহিত নেক আমলের প্রতীক। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭০১৮)
উসমান ইবনে মাজউন (রা.) এর পরিচিতি : মহান সাহাবি উসমান ইবনে মাজউন (রা.)-এর পূর্ণ নাম আবু সায়েব উসমান ইবনে মাজউন আল-জুমাহি। তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণকারী অগ্রণী সাহাবিদের একজন। বর্ণিত আছে, ১৩ জন ব্যক্তির পর তিনি রাসুল (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কায় মুসলমানদের নির্যাতন শুরু হলে তিনি তঁার পুত্র সায়েব (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। পরবর্তীতে কুরাইশরা ইসলাম গ্রহণ করেছে∏এমন গুজব শুনে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করার পর তিনি আর পুনরায় আবিসিনিয়ায় ফিরে যাননি। তখন তিনি মক্কায় অবস্থানের জন্য ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা-এর আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে উসমান ইবনে মাজউন (রা.) রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে মদিনায় হিজরত করেন এবং ইসলামের প্রথম ও ঐতিহাসিক যুদ্ধ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সেৌভাগ্য অর্জন করেন। দিনে রোজা রাখা এবং রাতে দীর্ঘ সময় নামাজে দঁাড়িয়ে থাকা ছিল তঁার নিত্য দিনের আমল। ইবাদতের প্রতি তার গভীর অনুরাগ এতটাই প্রবল ছিল যে তিনি বিবাহ থেকেও নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত রাখতে চেয়েছিলেন। তবে রাসুল (সা.) তাকে এ ব্যাপারে নিষেধ করেন এবং জীবনাচরণে মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেন। তিনি সেই সেৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের অন্তভূক্ত ছিলেন, যারা ইসলাম-পূর্ব জাহেলি যুগেও মদ্যপান থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিলেন। উহুদের যুদ্ধের পর অল্প সময়ের মধ্যেই মহান সাহাবি উসমান ইবনে মাজউন (রা.) ইনে্তকাল করেন। মদিনায় ইনে্তকালকারী মুহাজিরদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বপ্রথম। তাঁর ইনে্তকাল ইসলামের ইতিহাসে এক গভীর বেদনাবিধুর অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। যখন তাকে দাফন করা হয়, তখন রাসুল (সা.) নিজ হাতে তার কবরের মাথার দিকে একটি পাথর স্থাপন করেন এবং বলেন, এটি আমাদের পূর্বসূরীর কবর।’
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


