প্রায় দুই দশক স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকার পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংষদ নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি মনে করেন দীর্ঘদিন ধরে সমর্থকদের ভোটাধিকার সীমিত রাখার যে পরিস্থিতি ছিল, শাসন পরিবর্তনের পর তা বদলেছে।

মঙ্গলবার ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আরব নিউজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
সাক্ষাৎকারের শুরুতে লেখা হয়, ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ছেড়ে তারেক রহমান লন্ডনে বসবাস শুরু করেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে একাধিক মামলা ও দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে হাসিনা সরকার পতনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে।
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে দেশে ফেরেন ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান। বিমানবন্দর থেকে ঢাকার কেন্দ্র পর্যন্ত তার যাত্রাপথে লাখো মানুষ তাকে স্বাগত জানান। তিনি মনে করেন, তারাই নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন দেবে।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “বিএনপি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। আমরা ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে মানুষের ভোটাধিকারের জন্য সংগ্রাম করছি। আমরা জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করি। আমি বিশ্বাস করি, জনগণ আমাদের ভোট দেবে এবং ইনশাআল্লাহ আমরা ভূমিধস জয় অর্জন করব।”
রাজনৈতিক পটভূমি
তারেক রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ছেলে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের এই সেক্টর কমান্ডার ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৮১ সালে তার হত্যাকাণ্ডের পর দলের নেতৃত্ব নেন খালেদা জিয়া, যিনি ১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। মায়ের মৃত্যুর পর বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান।
নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রায় ৫০টি দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে সম্ভাব্য প্রধান বিরোধী দল হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে সহিংস অস্থিরতার পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব পালন করছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধাপরাধ তদন্তের কথা উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর অভিযোগ করেছে, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন দমনে সাবেক সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী পরিকল্পিত মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এতে আনুমানিক ১৪ শ’ জন নিহত হন।
জয়ের পর অগ্রাধিকার
নির্বাচনে জয়ী হলে সাবেক সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং তরুণদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রত্যাশা পূরণের কথা জানান তারেক রহমান।
প্রথম ১৮০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথা উল্লেখ করেন তিনি।তারেক রহমান বলেন, “আমাদের ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করব, কর্মসংস্থানভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করব এবং ব্লু ইকোনমি উন্নয়ন করব। আইসিটি খাত ও এআই-নির্ভর প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।”
পররাষ্ট্রনীতিতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের কথা বলেন তিনি, বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে। সৌদি আরবে ৩০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে।
তারেক রহমান বলেন, “আমি সৌদি ভিশন ২০৩০-কে প্রশংসা করি এবং সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।”
তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী হলে দায়িত্ব গ্রহণের শুরুর দিকেই সৌদি আরব সফর করতে চাই। ব্যক্তিগতভাবে পবিত্র মসজিদুল হারাম, মক্কায় ওমরাহ আদায় করতে চাই।”
ভারত ও পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে তোলার কথা জানান তারেক রহমান।
তারেক রহমান বলেন, “আমরা সব বন্ধু রাষ্ট্রের সঙ্গে, বিশেষ করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে, ভালো সম্পর্ক চাই। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হয়েছে। ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল নভেম্বরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তাকে ভারতে থেকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হয়।
তারেক রহমান বলেন, “আমরা দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। যে অপরাধ করেছে, তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে নয়; এটি ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের প্রশ্ন।”
শেখ হাসিনার আমলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা হয়েছিল, যেগুলো তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন তিনি।
গাইবান্ধায় ভোটের আগের জাতীয় পার্টির ৫০০ নেতাকর্মীর বিএনপিতে যোগদান
তারেক রহমান বলেন, “আমার বিরুদ্ধে বহু মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল, আর দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল ছিল না।সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমি ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনের আগে আমার প্রিয় বাংলাদেশে ফিরে এসেছি এবং নির্বাচনকে ঘিরে আমি অত্যন্ত আশাবাদী।”
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


