Advertisement
আলম রায়হান: প্রচলিত অতিসাধারণ একটি রম্য গল্প আছে। এক জামাই শ্বশুরবাড়ি প্রথম গেছে। কিন্তু সে কোনো কথা বলছে না। বাচাল গোছের এই জামাইকে স্বজনরা কথা কম বলার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু কথা বলতে গিয়ে কোন অপ্রয়োজনীয় কথা বেরিয়ে যায়- এ আশঙ্কায় অতিসাবধানী হয়ে কোনো কথাই বলল না নতুন জামাই। মুখে কুলুপ এঁটে থাকল। শ্বশুরবাড়ির সবাই চিন্তায় পড়ে গেল। মহাউদ্বিগ্ন শ্বশুর বিকালবেলা জামাইকে নিয়ে গেলেন নদীর তীরে খোলা পরিবেশে। নদীতীরে কিছুক্ষণ হাঁটার পর জামাই হঠাৎ বলল, আব্বা একটা প্রশ্ন করি? শ্বশুর খুবই খুশি হলেন। ভাবলেন, খোলা পরিবেশে মুক্ত বাতাসের প্রভাবে জামাইরত্নের মুখ খুলেছে। খুবই আগ্রহ নিয়ে বললেন, বল বাবা! জামাই বলল, আপনি বিয়ে করেছেন আব্বা! শ্বশুর হোঁচট খেলেন, মাথা ঘুরে যাওয়ার অবস্থা। সামলে নিয়ে বললেন, জি বাবা।
কাকে? : কেন, তোমার শাশুড়িকে। : জানতাম না তো, যাক আপনা আপনির মধ্যে ভালোই হয়েছে। প্রচলিত এ রম্য গল্পের শেষাংশ আরও নিদারুণ। সে প্রসঙ্গে শেষের দিকে আসছি। এদিকে এ গল্পের মতোই পরীমণির ঘটনায় আমরা আমজনতা অনেক কিছু জানতে পেরেছি যা আগে জানতাম না। হয়তো জাতীয় সংসদও জানত না। তবে সবাই জানেন, পরীমণি বাংলা সিনেমার নায়িকা। আর সিনেমা, তা হোক বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি; যে ভাষা বা যে দেশেরই হোক, সিনেমার মূল প্রবণতা প্রায় এক ও অভিন্ন। কেবল মানের হেরফের, তা আকাশপাতালও হতে পারে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রবণতা এবং জীবনাচারও প্রায় এক ও অভিন্ন। কাজেই পরীমণিরা কোন ধারায় চলেন তা নিয়ে এন্তার আলোচনা বা গবেষণার কিছু নেই। সহজেই বোধগম্য, জলের মতো সহজ।

কেবল সিনেমা বলে কথা নয়, গ্লামার জগতে প্রবেশ ও প্রতিষ্ঠার জন্য কোন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, এগোতে হয় কোন তরিকায় তা কমবেশি অনেকেরই জানা। এ নিয়ে অনেক রটনা আছে, ঘটনাও কম নয়। আলোঝলমলে জগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পথে যারা ছোটেন তাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যকই গোলপোস্ট পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন। গোল দেওয়ার সুযোগ পান আরও কমসংখ্যক। বাকিরা হারিয়ে যান শুরুতে বা মাঝপথে। কেউ চলে যান অন্ধকার জগতে। কালেভদ্রে অন্ধকার জগৎ থেকে কেউ কেউ মুক্ত হয়েও আসেন। তখন এ নিয়ে কিছুদিন হইচই হয়। হৃদয়ের মতো ছিকেরা ধরা পড়ে। এর আগে সবকিছুই চলে বাধাহীনভাবে, সমান ধারায় চলে পরেও। এসব ওপেন সিক্রেট। কেবল কোনো ঘটনা ঘটলে জাগে সবাই, জাতীয় জাগরণ গোছের! তখন আমরা আমজনতা অনেক কিছু জানতে পারি। অথবা জানা কথা আবার জানি। অনেক রথী-মহারথী জ্ঞানগর্ভ কথা বলেন। সবাই যেন কেবল একটি রসালো ইস্যুর অপেক্ষায় থাকেন। পেলেই শুরু হয় উথালপাথাল ঢেউ। যেমন পরীমণির ঢেউ। যা করোনার ঢেউয়ের চেয়েও অধিক আলোচিত। সব দেখে খুবই বলতে ইচ্ছা করে, ধন্য ধন্য পরীমণি তুমি অনন্য!

কেননা পরীমণির কারণেই তো আমরা দেশবাসী করোনা মহামারীর আতঙ্ক খানিকটা সময় ভুলে থাকতে পেরেছি। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে করোনা আতঙ্কে খুব কম মানুষই আছেন। বেশির ভাগ মানুষই রয়েছেন ‘কুচ পরোয়া নেহি’ প্রবণতায়! যদিও ভারতীয় করোনার ধরন আমাদের সীমান্ত এলাকার জনপদ বিপন্ন করে দিয়ে খোদ রাজধানী ঢাকায় পৌঁছে গেছে বেশ আগেই। এ ব্যাপারে খবর হচ্ছে, ঢাকায় করোনার ৬৮% নমুনা ‘ভারতীয় ধরন’। সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকায় আক্রান্ত বেড়েছে তিন গুণের বেশি। করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহ এ অবস্থার মধ্যেও পরীমণি ইস্যুতে তোলপাড় হয়েছে মহান জাতীয় সংসদ। এমনকি এ ইস্যুতে খোদ রাজধানী ঢাকা শহরে অসংখ্য ক্লাব ও দেদার মদ বাণিজের কথা ‘জানতে’ পেরেছেন মাননীয় সংসদ সদস্যরা এবং এ নিয়ে তারা খুবই জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এমনকি অতীত টেনে এনে রাজনীতি করারও সুযোগ নিয়েছেন। মানতেই হবে, সংসদ সদস্যদের নানান ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়াই তো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় মাননীয় সংসদ সদস্যদের এন্তার সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্র কত অর্থই তো ব্যয় করে। আর অন্য সব সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি কথা বলার সুযোগও থাকতে হবে। সংসদে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায় না বলে কত অভিযোগই তো ওঠে প্রতিনিয়ত, কত ওয়াকআউট, কত ফাইলপত্র ছোড়াছুড়ি। তাই কেবল প্লট, ট্যাক্স ফ্রি বিলাসবহুল আলিশান গাড়ি আর আর্থিক সুযোগ-সুবিধার পরও মাননীয় সংসদ সদস্যদের কথা বলার সুযোগ থাকতেই হবে। এ রকমই একটি সুযোগ করে দিয়েছেন করোনায় বেকার নায়িকা পরীমণি। কাজেই ধন্য তুমি পরীমণি। পরীমণিকে নিয়ে কেবল সংসদে মাননীয় সদস্যরা নন, নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও দলের নেতার তুঘলকি সিদ্ধান্তে সংসদে না যেতে পারার বেদনায় ভারাক্রান্ত বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, জনগণকে বিভ্রান্ত করতে পরীমণি ইস্যু সামনে এনেছে সরকার। কি ‘মূল্যবান’ বয়ান! এই হচ্ছে দেশের জনগণের মেধা-মনন সম্পর্কে প্রধান বিরোধী দলের মহাসচিবের ধারণা। অবশ্য এ প্রসঙ্গে কম কথাই হয়েছে মাঠের রাজনীতিতে। তবে তুমুল বিতর্ক হয়েছে সংসদে। ক্লাব সংস্কৃতি, মদ, জুয়া নিয়ে কথা হয়েছে অনেক। দেশবাসী সংসদ টিভির মাধ্যমে সরাসরি দেখেছেন, বোট ক্লাবে নায়িকা পরীমণিকে ‘ধর্ষণ চেষ্টার’ অভিযোগের সূত্র ধরে বিভিন্ন ক্লাব এবং মদ ও জুয়া নিয়ে ১৭ জুন জাতীয় সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাব, মদ এবং জুয়া নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা ও বিতর্ক করেছেন জাতীয় পার্টি, বিএনপি, তরিকত ফেডারেশন এবং সরকারি দল আওয়ামী লীগের সদস্যরা। এর মধ্যে শেখ সেলিমের মতো সিনিয়র নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও হেভিওয়েট সদস্যও রয়েছেন। অতএব পরীমণি ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার, যোগ্য হকদার। তবে সংসদকে ধন্যবাদ দেওয়া কঠিন। কারণ বিপুল অর্থব্যয়ে পরিচালিত অধিবেশনে যে সময়টা ব্যয় করার কথা মহামারী করোনার আগ্রাসী থাবার বিষয়ে করণীয় নিয়ে, সে সময়টা ব্যয় করা হয়েছে নায়িকা পরীমণিকে কেন্দ্র করে। এ ক্ষেত্রে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্ব সক্রিয় থেকে থাকতে পারে হয়তো। প্রশ্ন হতে পারে, খোদ রাজধানীতে ব্যাঙের ছাতার মতো নানা নামের ক্লাব আর তাতে মদের নহর বয়ে যাওয়ার খবর জানতে করোনাকালে বেকার অথচ অকল্পনীয় ধনবান বাংলা সিনেমার নায়িকা পরীমণির স্বরচিত ও নিপুণ অভিনীত মধ্যরাতের নাটক মঞ্চায়ন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো কেন? পুলিশ বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কেন জানে না এসব ক্লাবে মদের নহর বয়ে যাওয়ার খবর? মানতেই হবে, উল্লিখিত ওই দুই সংস্থাসহ এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সবারই জানা আছে বিষয়টি। না জানার কোনো কারণ নেই। তবু সবাই চুপ। হয়তো সবাই ধরণির মতো সর্বংসহা। অথবা অন্যান্য দুই নম্বরি ব্যবসার মতো রঙিন পানির ব্যবসা চালাতে ছোট ছোট রঙিন কাগজের সরবরাহ ও দাপট বেড়েছে! এ কারণেই হয়তো যে যার অবস্থানে থেকে শান্তি রক্ষা করে চলেছেন। অনুমান করা চলে, রঙিন জগতের পরীরাও মালদার নাসির মাহমুদদের সঙ্গেও শান্তি রক্ষা করেই চলেন। দুই তরফই গীত গায় এক সুরেই। একজনের পুঁজি জন্মগত, অন্যজনের অর্জিত। লেনাদেনা চলে সমঝোতায়ই। কিন্তু লেনদেনে হেরফের হলেই শুরু হয় বেসুরো গান। যেমন সুরের মূর্ছনা ভেঙে সেদিন হঠাৎ বেসুরো গান শুরু করলেন নায়িকা পরীমণি। এই সুনিপুণ অভিনয়ের জন্যও তাকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। আর পরীমণি ইস্যুতে আলোচনায় একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের অবতারণা হয়েছে জাতীয় সংসদে। তা হচ্ছে, অভিজাত বিভিন্ন ক্লাবে বিশাল অঙ্কের টাকা দিয়ে সদস্য হতে হয়। এ বিষয়ে ২০-৩০ লাখ টাকা থেকে কোটি ছাড়ানোরও দৃষ্টান্ত আছে। এ বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে এসব ক্লাবের সদস্য হয়েছেন অনেক সরকারি কর্মকর্তাও। একটি ক্লাবের সদস্য হওয়ার জন্য এত টাকার ব্যবস্থা সরকারি কর্মকর্তারা কীভাবে করেন? এ প্রশ্নের জবাবও কিন্তু ওপেনসিক্রেট। সংসদে উত্থাপিত প্রশ্নও তাই। তবে বিষয়টি অন রেকর্ড জেনেছেন দেশবাসী। লেখা শেষ করার আগে শুরুতে উল্লেখ করা রম্য গল্পের শেষাংশ বলতে চাই। নদীতীরে হাঁটতে হাঁটতে জামাই প্রশ্ন করল, আব্বা, এত বড় নদী হইল কেমনে? সীমাহীন রাগ চেপে রেখে শ্বশুর জবাব দিলেন, আল্লার রহমতে।
তা না হয় মানলাম, কিন্তু নদীর মাটি গেল কোথায়?

এবার শ্বশুরের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। ভাঙারই কথা। বললেন, অর্ধেক মাটি খেয়েছে তোমার বাবা তোমাকে জন্মদান করে; আর অর্ধেক খেয়েছি আমি তোমাকে কন্যা দান করে!

প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা আমজনতা কার মতো? আমরা কি জামাইর মতো বোকা? আমরা জামাইর বাবার মতো অনাসৃষ্টির স্রষ্টা, নাকি শ্বশুরের মতো পরিস্থিতির শিকার? জানি, এ প্রশ্নের কোনো উত্তর মিলবে না। জীবনানন্দ দাশের কবিতায়ই তো বলা আছে, মেলে নাকো উত্তর।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saiful Islam is a journalist at Zoom Bangla News with seven years of experience in news writing and editorial work. He contributes to producing accurate, well-structured, and reader-focused content across digital platforms. His work reflects a strong commitment to editorial standards and responsible journalism.