ড. এ কে এম মাকসুদুল হক : রূপসী বাংলার রূপের ছটা দেশব্যাপী ছড়িয়ে রয়েছে। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় বাংলার গ্রামে-গঞ্জে প্রকৃতি সাজে নানান সাজে। সেই সাথে দেশের দক্ষিণ-পূর্বে সাগর আর পাহাড়ের সহাবস্থান মাতৃভূমির রূপকে দিয়েছে পরিপূর্ণতা। পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার পাহাড়ি সৌন্দর্য তাই দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিয়াসী মানুষকে বার বার টানে। এখানে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ আলুটিলা। আর দুঃসাহসী অভিযাত্রিকদেরকে হাতছানি দেয় আলুটিলার রহস্যময় গুহা।

Advertisement

আলুটিলা গুহাকে স্থানীয় পাহাড়িরা ডাকে ‘মাতাই হাকর’ নামে। এর অর্থ হলো এটা সেই গুহা যেখানে ভগবান বাস করেন। খাগড়াছড়ি জেলা শহরে ঢোকার ৮ কিলোমিটার আগে মাটিরাঙ্গা উপজেলায় রয়েছে আলুটিলা পাহাড়। পাহাড়টি সমুদ্র সমতল থেকে তিন হাজার ফুট উঁচুতে। আলুটিলা পাহাড়ের চূড়া থেকে ২৬৬টি ধাপের সিঁড়ি বেয়ে নামলেই পাওয়া যাবে সেই রহস্যময় গুহা। গুহাটি প্রায় ৩৫০ ফুট দীর্ঘ, ব্যাস ১৮ ফুট। শতবর্ষ পুরনো এই গুহার ভিতের ঘুটঘুটে অন্ধকার। এর ভেতরে দু’টি বাঁক থাকায় বাইরের ছিটেফোঁটা আলোও প্রবেশ করতে পারে না। গুহায় প্রবেশ করে এক-তৃতীয়াংশ গিয়ে বামে একটি অন্ধকার বাঁক বা ব্লাইন্ড কর্নার এবং দুই-তৃতীয়াংশ পেরিয়ে ডানে বাঁক। এরপর একটু বামে ঘুরেই বাইরের আলোর দেখা পাওয়া যায় অর্থাৎ বের হওয়ার মুখের সন্ধান পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রথমে সিঁড়ি ভেঙে প্রায় ৩৭০ ফুট পাহাড় থেকে নেমে গুহার প্রবেশমুখে ঢুকে আবার ৩৫০ ফুট দীর্ঘ গুহার ভেতর দিয়ে উপরের দিকে উঠে এলে বাইরের মুখ পাওয়া যাবে। গুহার মুখে ঢোকার সাথে সাথে আরামদায়ক শীতল পরশ পাওয়া যায়, যেন প্রাকৃতিক শীতাতপ ব্যবস্থা। গুহার মাঝ বরাবর ব্যাস একটু কম হওয়ায় কখনো কখনো কুঁজো হয়ে হাঁটতে হয়। ভেতরে মাটি-পাথরের দেয়াল বেয়ে ঝির ঝির করে প্রাকৃতিকভাবে পানি বেরিয়ে এসে নিচের দিকে গুহার বাইরে একটি জলাধার বা ঝরনা সৃষ্টি করেছে। তাই গুহার ভিতর হাঁটার সময় স্থানে স্থানে ছোট ছোট গর্তে জমাট পানিতে পায়ের পাতা ডুবে যায়। পুরো গুহাটিই ছোট-বড় পাথরে পরিপূর্ণ, যেগুলোর কোনো কোনোটি অমসৃণ ও পিচ্ছিল। তাই সাবধানে কদমে চলতে হয়। আর ঘুটঘুটে অমাবস্যার রাতের মতো নিকষ কালো অন্ধকারে আলো বহন করা অত্যাবশ্যক। টর্চলাইট বা সেল ফোনের টর্চ জ্বলে চলতে হয়।

আলুটিলা গুহায় ভ্রমণ চ্যালেঞ্জিং এবং রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। গুহামুখে প্রবেশ করে কিছু দূর এগুলেই সামনে-পিছনে নেমে আসে অন্ধকার। কালো অন্ধকারে শীতল আবহাওয়া আর পাহাড়ের পাদদেশের চুঁইয়ে পড়া পানির ঝিরঝিরে শব্দ মন ও সত্ত্বাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যায়। যেন কবরের অন্ধকার! কখনো মনে হয় স্বেচ্ছায় কি মৃত্যুপুরীতে চলে যাচ্ছি! খুব সাহসী মানুষের মনেও ভীতির সঞ্চার হয়। মনে প্রশ্ন জাগে, সামনে গুহার মুখ খোলা পাবো তো? আবার পেছনের দিকে ফিরে যাব নাকি? পেছনে ফিরে যেতে থাকলে পরে পিছনে যারা আসছে তাদের সাথে সংঘর্ষ ও চাপাচাপি হয়ে দম বন্ধ হয়ে যাবে না তো? ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে অজানার ভীতি আর মনের সাহস সঞ্চারের সংমিশ্রণে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে করতে ১৫ মিনিটের মধ্যেই গুহার বাহিরমুখের আলো দেখা যাবে। সাথে সাথে মনের সব ভীতি দূর হয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী ব্যক্তি বলে মনে হবে নিজেকে। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে কৃতজ্ঞতায় হৃদয়-মন নুইয়ে আসবে। নিজেকে মনে হবে বিশ্বজয়ী!

আলুটিলা গুহায় এলে মহান সৃষ্টিকর্তার অজস্র নিদর্শনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পাহাড়ের নিচ দিয়ে এই যে সুড়ঙ্গ, এটা কি এমনিতেই সৃষ্টি হয়েছে? ভেতরের পাথর, মাটি ভেদ করে অবিরাম পানির প্রবাহ; চার পাশের মজবুত মাটি-পাথরের দেয়াল এগুলো কি আপনা আপনিই এভাবে গঠিত হয়ে আছে? ভেতরে দু’টি বাঁকের কারণে আলো না ঢুকলেও অক্সিজেন প্রবাহিত হচ্ছে যেন মানুষ আল্লাহর এই নিদর্শন দেখতে গিয়ে অসুবিধায় না পড়ে।

একজন মুসলিম পর্যটক এই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে গিয়ে একবারের জন্য হলেও অনুভব করবেন কবর তো এমনই অন্ধকারাচ্ছন্ন হবে! তখন আমার অবস্থাটা কী হবে? একজন মুসলমানের হৃদয়ে এই গুহার অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি ছোঁয়া দিতে পারে। পবিত্র কুরআনে কমপক্ষে দুই স্থানে গুহার কথা এসেছে। তার মধ্যে একটি স্থান মুসলমানদের জন্য খুবই হৃদয়স্পর্শী ও অত্যন্ত উদ্বেগের! সেটি হলো সওর গিরিগুহা (সূরা তাওবা, ৯:৪০)। রাসূলুল্লাহ সা:-কে মক্কার কাফির সন্ত্রাসীরা হত্যা করার পরিকল্পনা করলে রাসূলুল্লাহ সা: আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে মদিনায় হিজরত করার পথে হজরত আবু বকর রা:-এর সাথে সওর গিরিগুহায় আশ্রয় নেন। আল্লাহ তায়ালার সীমাহীন অনুগ্রহে তখন সেই গুহার মুখে রাতারাতি একটি আগাছা জন্মায়। গাছের ডালে একটি কবুতর বাসা বেঁধে তাতে দু’টি ডিম পেড়ে রাখে। আর একটি মাকড়সা গুহার মুখ বরাবর জাল বুনে রাখে। ফলে কাফিররা রাসূল সা:-কে খুঁজতে এসে গুহার কাছে এসেও এর ভেতর কোনো মানুষ থাকতে পারে না ভেবে ফিরে যায়। তিন দিন এখানে অবস্থানের পর রাসূলুল্লাহ সা: সুযোগমতো মদিনার উদ্দেশে রওনা করেন এবং নিরাপদে মদিনা পৌঁছেন (সিরাত বিশ্বকোষ, ৫ম খণ্ড : পৃ-২৩৮, ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৩)। গুহাসংক্রান্ত ইসলামের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিষয়টি হলো ‘আসহাবে কাহাফের’ ঘটনা (সূরা কাহাফ, ১৮:৯-২২)। ‘কাহাফ’ অর্থ বিস্তীর্ণ গুহা। ২৫০ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যের অধীন জর্ডানের আফসোস নামক নগরের পাহাড়ে একটি গুহায় সাত যুবক আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা তাওহিদে বিশ্বাসী ছিলেন বলে সম্রাট ডিকিয়ানুস তাদেরকে হত্যা করতে চাইলে তারা নগর থেকে পালিয়ে এসে সে গুহায় আশ্রয় নেন। গুহায় প্রবেশ করে তারা সেখানে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন আর তাদের সাথে আসা একটি কুকুর গুহার মুখে পাহারাদারের মতো বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আল্লাহ তায়ালার অপার মহিমায় তারা ৩০০ সৌর বছর এভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। ঘুম ভেঙে গেলে ক্ষুধা নিবারণের উদ্দেশ্যে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে গেলে ঘটনা জানাজানি হয়ে যায়। তখন তারা আবার গুহায় প্রবেশ করে শুয়ে পড়লে তাদের মৃত্যু হয় (Atlas of the Qura’n, Dr. Shouki Abu Khalil, Riyadh : Dar-us-Salam, KSA, 2003, P-172)। এভাবে গুহার ইতিহাসের ইঙ্গিতের মাধ্যমেই আমাদের কাছে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ এবং তাঁরই অসীম ক্ষমতার শিক্ষা পৌঁছেছে। ফলে গুহার বিষয়ে ইসলামের অনুসারী অনেক মানুষের মনে গভীর আগ্রহ থাকতে পারে।

চিন্তাশীল হৃদয় ও বুদ্ধিমান মানুষের জন্য আমাদের আলুটিলা গুহাতেও শিক্ষার উপাদান রয়েছে। এ গুহাকে আমরা পর্যটনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের জন্যও ব্যবহার করতে পারি। বিভিন্ন বাহিনীতে মৌলিক প্রশিক্ষণের সময় শিক্ষার্থীদের ‘কনফিডেন্স’ বিল্ড আপের জন্য এবং ‘অজানা’র ভয় (যুদ্ধের সময় অজানার ভয় সৈনিকের মনোবল ভেঙে দেয়। সামরিক পরিভাষায় এটিকে Fear of unknown বলে), দূর করার উদ্দেশ্যে কমপক্ষে একবারের জন্য হলেও এই গুহা ভ্রমণ করানো দরকার। এ ছাড়া স্কুলের নবম-দশম শ্রেণী থেকে শুরু করে বিশ^বিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরও প্রয়োজন এর অভিজ্ঞতা নেয়া, যেন তারা জীবন-সংগ্রামের মনোবল অর্জনের উপাদান এখান থেকে সংগ্রহ করতে পারে। যেসব রেমিট্যান্স যোদ্ধা বিদেশে যাবেন দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে, তাদের জন্যও এই গুহার অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে জীবিকা অর্জনের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে। আর যারা আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির রহস্যঘেরা নিদর্শন দেখতে চান তারাও এই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। এসব ছাড়াও অসংখ্য মানুষ পৃথিবীব্যাপী রয়েছেন যারা ভ্রমণবিলাসী এবং প্রকৃতির চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে মুখিয়ে থাকেন। তাদেরকে আকর্ষণের জন্য দেশের বাইরেও আলুটিলা গুহার আকর্ষণীয় প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে।

আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের বর্তমান ব্যবস্থাপনা সন্তোষজনক হলেও সেটার আরো আধুনিকায়নের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গুহা ভ্রমণের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। গুহার প্রবেশ এবং বাইর মুখে প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা প্রহরী থাকতে হবে। এই দুই প্রহরীর মধ্যে সার্বক্ষণিক বেতার যোগাযোগ থাকতে হবে। পর্যটকদের গ্রুপ করে একজন করে গাইডের তত্ত্বাবধানে প্রবেশ করতে হবে। গাইডের সাথে প্রয়োজনীয় আলো এবং বেতারযন্ত্র থাকতে হবে। এক্সিট পয়েন্টকে সবসময়ই জনজটমুক্ত রাখতে হবে। অর্থাৎ গুহা থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে পর্যটকদেরকে গেটের বাইরে বের করে নিয়ে আসতে হবে। একটি গ্রুপ গুহায় প্রবেশের কমপক্ষে ৮ মিনিট পর পরবর্তী গ্রুপকে প্রবেশ করাতে হবে। প্রতিটি গ্রুপ গুহায় প্রবেশের আগে প্রবেশমুখে গুহার প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফিং দিতে হবে। গুহার বাইরে একটি রেসকিউ টিম বা উদ্ধারকারী দল সার্বক্ষণিকভাবে স্ট্যান্ডবাই রাখতে হবে। উদ্ধারকারী দলে প্রয়োজনীয় এক্সপার্ট ও ডাক্তার থাকতে হবে। সেই সাথে আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখতে হবে। এ ছাড়া মাঝে মধ্যেই ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞসহ একটি ছোট্ট নিরাপত্তা দল দিয়ে গুহার ভেতরে টহলের ব্যবস্থা করতে হবে যেন গুহার ভেতরের নিরাপত্তা, মাটি ও দেয়ালের আচরণ বুঝে প্রয়োজনীয় ট্রিটমেন্ট দিয়ে বা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। যারা স্নায়বিকভাবে দুর্বল, যাদের টানেল ফোবিয়া রয়েছে তাদেরকে গুহা ভ্রমণের বিষয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিতে হবে।

মানুষ সব সময়ই নিরাপত্তার বিষয়টি আগে চিন্তা করে। কাজেই এ ধরনের কম্প্রিহেনসিভ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সার্বিক একটি আধুনিক ব্যবস্থাপনা দৃশ্যমান থাকলে আলুটিলার গুহা জয়ের জন্য পর্যটকরা হুমড়ি খেয়ে পড়বে। তবে এ জন্য প্রয়োজন যথাযথ ভিশন ও লক্ষ্য ঠিক করে সুচিন্তিত পরিকল্পনা এবং সেই সাথে তা বাস্তবায়নে সমন্বিত প্রচেষ্টা। আমরা যদি আলুটিলা গুহাকে দেশের তরুণদেরকে আত্মপ্রত্যয়ী করে গড়ে তোলার প্রশিক্ষণের একটি উপাদান এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই তবে তা সহজেই সম্ভব।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
Email: maksud2648@yahoo.com

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saiful Islam is a journalist at Zoom Bangla News with seven years of experience in news writing and editorial work. He contributes to producing accurate, well-structured, and reader-focused content across digital platforms. His work reflects a strong commitment to editorial standards and responsible journalism.