নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে বোরো মৌসুম মানেই ছিল কৃষকের মুখে হাসি। তবে চলতি বছর সেই চিরচেনা চিত্র বদলে গেছে। সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলেও অধিকাংশ কৃষকের ঘর এখন ফাঁকা। ফসল নেই, নেই ন্যায্য দামে বিক্রির সুযোগ—বরং পুরো প্রক্রিয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছেন প্রকৃত উৎপাদকরা।

অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং শ্রমিক সংকট মিলিয়ে এবারের মৌসুম কৃষকদের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হলেও এর মধ্যে ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ফসল ইতোমধ্যে নষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৬৯ হাজার ৬৯৮ জন কৃষক এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১৩ কোটি টাকা।
কৃষকদের ভাষ্য, বৈশাখের শুরুতে ধান কাটার সময় এলেও শ্রমিক সংকটে অনেকেই সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। এরই মধ্যে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পাকা ধান মুহূর্তেই তলিয়ে যায়। যেটুকু কাটা সম্ভব হয়েছে, তা-ও শুকানোর সুযোগ মেলেনি। রোদ না থাকায় ভেজা ধান সংরক্ষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে নামমাত্র দামে ধান বিক্রি করতে হয়েছে।
অনেক কৃষক বলেন, “ধান ঘরে রাখার সুযোগ নেই, তাই কম দামে হলেও বিক্রি করা ছাড়া উপায় ছিল না।”
সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রির জন্য ১৪ শতাংশ আর্দ্রতার শর্ত থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। বৈরি আবহাওয়ায় ধান শুকানো না যাওয়ায় সরকারি ক্রয়কেন্দ্রেও ধান দিতে পারছেন না কৃষকরা।
এই সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মধ্যস্বত্বভোগী ও মিলাররা। তারা কম দামে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে পরে সরকারি গুদামে সরবরাহ করছে। ফলে সরকারি সুবিধা চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের হাতে, আর প্রকৃত কৃষক থাকছেন বঞ্চিত।
তবে মিল মালিকদের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, তারা বাজার থেকেই তুলনামূলক বেশি দামে ধান সংগ্রহ করছেন। পরিবহন, শুকানো ও সংরক্ষণের অতিরিক্ত খরচ থাকায় তাদের এই ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তবুও বাস্তবতা বলছে, এই ব্যবস্থায় কৃষক সরাসরি লাভবান হচ্ছেন না। বরং বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারাই।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। অন্যদিকে খাদ্য বিভাগ বলছে, নির্ধারিত মান বজায় রেখে ধান সরবরাহ করা হলে তা অবশ্যই কেনা হবে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—যখন প্রকৃত কৃষকই সেই মান অনুযায়ী ধান প্রস্তুত করতে পারছেন না, তখন এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর?
প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে ফসল ফলানো কৃষকরা এবার প্রকৃতির কাছেই পরাজিত। তার ওপর নীতিগত জটিলতা ও বাস্তবতার অমিল সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ প্রয়োজন—ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, কৃষিঋণ মওকুফ বা পুনঃতফসিল, সরাসরি নগদ সহায়তা এবং আর্দ্রতার শর্ত শিথিল করে বাস্তবমুখী ক্রয়নীতি গ্রহণ। অন্যথায় সরকারি উদ্যোগ থাকলেও এর সুফল পাবে না প্রকৃত কৃষক, আর এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


