Advertisement

জুমবাংলা ডেস্ক : রাজধানীর খিলক্ষেত দরজি বাড়ি এলাকার একটি বাসা থেকে সাথী আক্তার নামের এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সাথীর ভাই খিলক্ষেত থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় আসামি করেন তার দ্বিতীয় স্বামী জোবায়ের হোসেন শুভ (২৩) কে। সেই মামলার তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এটি হত্যা না আত্মহত্যা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। মামলার ছায়া তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গভীর তদন্তে ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ক্লু পান এ ঘটনায় পেছনে সাথীর দ্বিতীয় স্বামীর হাত থাকতে পারে।

জানা যায়, ২০১৮ সালে শুভ’র সঙ্গে ফেসবুক ও টিকটকের মাধ্যমে পরিচয় হয় সাথীর। স্বামী প্রবাসী ও দীর্ঘদিন ধরে দেশে না আসায় সাথী ফেসবুক ও টিকটক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সারাদিন ফেসবুক চালাতো আর টিকটক ভিডিও তৈরি করে ফেসবুকে আপলোড করতো। ২০১৮ সালে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে সাথী আক্তারের সঙ্গে বগুড়ার জুবায়ের হোসেন শুভর (২৩) পরিচয়। অতঃপর প্রেম। প্রেম থেকে শুভ পরিণয়ের আশায় প্রথম স্বামীকে তালাক দিয়ে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর জুবায়েরকে বিয়ে করেন সাথী। তবে মাস তিনেক না যেতেই তাদের মধ্যে শুরু হয় মনোমালিন্য। অবশেষে বিচ্ছেদ। কিন্তু বিচ্ছেদের আট মাস পর পুনরায় রাজধানীর খিলক্ষেতের বাসায় একসঙ্গে বসবাস (লিভ টুগেদার) শুরু করেন জুবায়ের ও সাথী। অবৈধ সম্পর্কের এ সুখের সংসারও তাদের বেশি দিন টিকল না! বিচ্ছেদের (ডিভোর্স) পরও প্রথম স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং টিকটক-লাইকিতে ভিডিও প্রচারসহ নানা কারণে পুনরায় তাদের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। একপর্যায়ে মাত্র চার হাজার টাকা নিয়ে বিবাদের জেরে চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে সাথীকে হত্যা করেন জুবায়ের।

মাত্র ২০ দিনের মাথায় সাথী আক্তারের হত্যার রহস্য উদঘাটন প্রসঙ্গে এমন তথ্য জানান ঢাকা মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশ গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. মশিউর রহমান। তিনি জানান, ঘটনার পরম্পরা, আলামত ও সুরতহাল দেখে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাই ধাঁধাঁয় পড়ে যান। প্রাথমিকভাবে সবাই মনে করেন সাথী আক্তার আত্মহত্যা করেছেন। তবে জুবায়েরকে গ্রেফতারের পর স্পষ্ট হয় তিনি পরিকল্পিত হত্যার শিকার। সাথী আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয় ১৪ সেপ্টেম্বর। ১৬ সেপ্টেম্বর খিলক্ষেত থানায় নিহতের পরিবার হত্যা মামলা (মামলা নং- ১৮) দায়ের করেন। মামলায় দ্বিতীয় স্বামী জুবায়ের হোসেন শুভকে আসামি করে তাকে পলাতক দেখানো হয়। গত ৩ সেপ্টেম্বর (রোববার) ভোরে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার গাজী কালুসা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ গুলশান বিভাগের এডিসি এস এম রেজাউল হকের নেতৃত্বে ক্যান্টনমেন্ট জোনাল টিমের একটি দল জুবায়ের হোসেনকে গ্রেফতার করে। ওই দিন বিকেলে ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তাকে সোপর্দ করা হয়। সেখানে তিনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

এ প্রসঙ্গে ডিসি মো. মশিউর রহমান বলেন, গত মাসে (১৪ সেপ্টেম্বর) খিলক্ষেত থানা এলাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডটি এত নিখুঁতভাবে করা হয় যে আমরা দ্বিধায় পড়ে যাই। জুবায়েরকে গ্রেফতারের পরও মনে হয়েছে তিনি (সাথী আক্তার) আত্মহত্যাই করেছেন। তবে, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে জুবায়ের শিকার করেন যে তিনি সাথীকে হত্যা করেছেন। আদালতেও তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। হত্যার কারণ দেখিয়ে মশিউর রহমান বলেন, সাথী আক্তারের প্রথম স্বামী সৌদি আরবে থাকেন। তার টাকায় বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। থাকতেন ভাড়া বাসায়, ব্যবহার করতেন স্মার্টফোন। সেই ফোন দিয়ে ভিডিও বানিয়ে টিকটিক-লাইকিতে শেয়ার করতেন। ফেসবুকে বিচরণ করতে গিয়ে বগুড়ার ছেলে জুবায়েরের সঙ্গে পরিচয় হয় সাথীর। এরপর প্রেম ও বিয়ের সম্পর্কে জড়ান। প্রথম স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে থাকা শুরু করেন চট্টগ্রামে। সেখানে তাদের মনোমালিন্য হলে গত বছরের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় স্বামী জুবায়েরকেও ডিভোর্স দেন। চট্টগ্রাম থেকে বোনের বাড়ি রাজশাহীতে চলে যান সাথী আক্তার। বিচ্ছেদের পরও এ সময় প্রথম স্বামীর টাকায় চলতেন সাথী আক্তার। রাজশাহীতে গিয়ে ফের দ্বিতীয় স্বামী জুবায়েরের সঙ্গে যোগাযোগ হয়।

বিচ্ছেদের আট মাস পর পুনরায় বিবাহ ছাড়াই একসঙ্গে (লিভ টুগেদার) বসবাসের জন্য রাজধানীর খিলক্ষেত দরজি বাড়ি এলাকার একটি বাসা ভাড়া নেন এবং সেখানে বসবাস শুরু করেন। ঢাকায় আসার পরও তারা প্রথম স্বামীর টাকায় জীবনযাপন করছিলেন বলে জানান ডিসি মো. মশিউর রহমান। তিনি বলেন, ফের বিয়ের জন্য চাপ দিলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন জুবায়ের— এমন ভয়ভীতি দেখান সাথী। জুবায়েরের সামনেই ভিডিও কলে প্রথম স্বামীর সঙ্গে কথা বলতেন। শুধু তা-ই নয়, বার বার নিষেধ করার পরও টিকটক-লাইকিতে ভিডিও শেয়ার করতেন সাথী। ফোনে কথা বলতেন একাধিক ছেলে বন্ধুর সঙ্গে। সাথীর এমন আচরণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত জুবায়ের তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া প্রসঙ্গে এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, পরিকল্পনা মোতাবেক গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে প্রথম স্বামীর দেওয়া চার হাজার টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে পেছন থেকে সাথীর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। মশিউর রহমান বলেন, হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে সাথীর মরদেহ বিছানা থেকে টেনে-হিঁচড়ে বাথরুমে নিয়ে যান জুবায়ের। এরপর বাথরুমের ভেন্টিলেটরের রডের সঙ্গে তাকে ঝুলিয়ে দেন। কিন্তু পা মেঝেতে লেগে যাওয়ায় জুবায়ের সবজি কাটার বটি দিয়ে ওড়না কেটে দেন। বাথরুমের দরজার ছিটকিনিও বটি দিয়ে ভেঙে ফেলেন। যাতে সবাই ধারণা করেন, সাথী আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল এবং তিনি তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। পরে জুবায়ের মোবাইল ও টাকা নিয়ে পালিয়ে যান।

এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, প্রত্যেকটি পরিবারেরই সুস্থ বিনোদন প্রয়োজন। টিকটক-লাইকিসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে আসক্তি এবং অবৈধ সম্পর্কের মতো সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয়ে আমাদের আরও বেশি সচেতন হওয়া উচিত। তা না হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। এ বিষয়ে ডিএমপি’র গোয়েন্দা প্রধান ও পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, সাথী আক্তার হত্যা মামলাটি তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন জুবায়ের। কারণ, জুবায়ের হত্যা করলেও পরিকল্পিতভাবে আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছিলেন। তিনি বলেন, এ হত্যার নেপথ্যে কাজ করেছে টিকটক-লাইকিতে ভিডিও প্রচার, ভারতীয় সিরিয়াল দেখা এবং অবৈধ সম্পর্ক। এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে, যা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের একটি রূপমাত্র।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.