ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলো জাকাত, যা মুসলিম সমাজে সম্পদের ভারসাম্য ও দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে। অন্যদিকে রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতরের আগে আদায় করা সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা মুসলমানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি রোজাদারের আত্মশুদ্ধি এবং দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর একটি বিশেষ ব্যবস্থা। তাই জাকাত ও ফিতরা উভয়ই দান-ইবাদত হলেও উদ্দেশ্য, সময় ও বিধানের ক্ষেত্রে এদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

মুসলমানদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসবের একটি ঈদুল ফিতর। আর এই ঈদুল ফিতরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ‘সদকাতুল ফিতর’, যার অর্থ হচ্ছে ‘ঈদুল ফিতরের সদকা’। বাংলাদেশে এটি ‘ফিতরা’ হিসেবে অধিক পরিচিত। ইসলাম ধর্মে এটি ‘জাকাত-আল-ফিতর’ হিসেবেও পরিচিত। ইসলাম ধর্মের নবী এই ‘ফিতরা’ নারী-পুরুষ এবং ছোট-বড় সবার জন্য নির্বিশেষে বাধ্যতামূলক করেছেন।
ইসলামি চিন্তাবিদরা বলছেন, রোজা পালনের সময় কোনো ত্রুটি বিচ্যুতি ঘটে থাকলে তা সংশোধন এবং সমাজের দরিদ্র মানুষ যাতে ভালোভাবে উৎসবে অংশ নিতে পারে সেজন্য এই ‘ফিতরার’ বিধান রাখা হয়েছে।
কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা
জাকাত সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন—
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ
‘তোমরা সালাত কায়েম কর এবং জাকাত আদায় কর।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ৪৩)
ফিতরা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে—
فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ، وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোজাদারকে অনর্থক ও অশালীন কথাবার্তা থেকে পবিত্র করার জন্য এবং মিসকিনদের খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য।’ (আবু দাউদ ১৬০৯)
আরও একটি হাদিসে এসেছে—
فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ عَلَى الْعَبْدِ وَالْحُرِّ وَالذَّكَرِ وَالْأُنْثَى وَالصَّغِيرِ وَالْكَبِيرِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের প্রত্যেক স্বাধীন-দাস, নারী-পুরুষ ও ছোট-বড় সবার ওপর এক সা’ পরিমাণ খেজুর বা যব সদকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন।’ (বুখারি ১৫০৩)
জাকাত ও ফিতরার মধ্যে পার্থক্য
জাকাত ও ফিতরার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জাকাতের বিধানের সঙ্গে রমজান বা ঈদের বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই; কিন্তু ফিতরার সঙ্গে রমজান ও ঈদের বিশেষ সম্পর্ক আছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় মুসলিমরা রমজান মাসে বেশি জাকাত দেন। সম্পদের পরিমাণ যত বেশি থাকে জাকাতের পরিমাণও তত বেশি হয়; কিন্তু ফিতরার ক্ষেত্রে বিষয়টি সে রকম নয়। ফিতরা নির্ধারিত একটি অঙ্ক। সঞ্চিত অর্থ কিংবা সম্পদের ওপর ফিতরার পরিমাণ নির্ভর করে না। সম্পদের পরিমাণ হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে ফিতরার পরিমাণ ওঠা-নামা করে না।
ইসলামিক স্কলারদের মতে, এক কোটি টাকার যিনি মালিক তার সদকাতুল ফিতরা যতটুকু, দুই লাখ টাকার যিনি মালিক তিনিও একই পরিমাণ অর্থ ফিতরা দেবেন।
যাদের জাকাত দেওয়ার সামর্থ্য আছে তাদের জন্য ফিতরা দেওয়া প্রযোজ্য। আবার যাদের ওপর জাকাত ফরজ নয়, তারাও ফিতরা দিতে পারবেন। অন্যদিকে কারা ফিতরা পাবেন? ইসলামের দৃষ্টিতে যিনি জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত তিনি ফিতরাও পাওয়ার ক্ষেত্রে উপযুক্ত হবেন।
রোজা পালন করার সময় মানুষ এমন কিছু ছোটখাটো ত্রুটিবিচ্যুতি করতে পারে যার জন্য তার রোজাকে মাকরুহ করে ফেলে, যেমন কোনো অশ্লীল কথা বলে ফেলেছে। এ ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে রোজা পরিশুদ্ধ হয়।
ফিতরার আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে ঈদের আগে দরিদ্র মানুষের জন্য আহারের ব্যবস্থা করা বা তাদের আর্থিকভাবে সাহায্য করা। যাতে তারা এই অর্থ দ্বারা ঈদের দিন উদযাপন করতে পারে।
জাকাত ও সদকাতুল ফিতর— উভয়ই ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। জাকাত মুসলিম সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে, আর ফিতরা রমজানের ইবাদতকে পরিশুদ্ধ করে এবং দরিদ্র মানুষের ঈদের আনন্দে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে। তাই প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের উচিত যথাসময়ে জাকাত ও ফিতরা আদায় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি সমাজে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করা।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


