256

Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সিলভাত জাফর অনেকদিন তার পরিবারকে জানাননি তার স্তনের মধ্যে একটি মাংসপেশী বাড়ছে। কারণ তার দেশে স্তন শব্দটি উচ্চারণ করাই বিশাল ‘অপরাধ’! এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে স্তন ক্যান্সারের হার সর্বোচ্চ। এ রোগ নিরাময়ের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে রোগ দ্রুত শনাক্ত করা, কিন্তু পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থার কারণে অনেক নারী এ নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনাও করতে চান না। খবর বিবিসি বাংলার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশটিতে ১৭ হাজারের বেশি নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। যদিও পাকিস্তানের চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত দাতব্য সংস্থাগুলোর হিসাবে এ সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি। দেশটির প্রতি নয়জনে একজন নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন, কিন্তু সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ট্যাবুর কারণে নারীদের পক্ষে নিজের শরীরের একটি প্রত্যঙ্গ নিয়ে কথা বলা, কিংবা নিজের অসুস্থতা নিয়ে কথা বলা ভীষণ কঠিন।

অথচ প্রকাশ না করলে সাহায্য পাওয়া যাবে না, আর তাতে আক্রান্ত রোগীর সেরে ওঠার সম্ভাবনা শূণ্যতে নেমে আসে। পাকিস্তানের ব্রেস্ট ক্যান্সার বিষয়ক দাতব্য সংস্থা পিংক রিবন ফাউন্ডেশনের ওমর আফতাব বলেন, ‘স্তন ক্যান্সার যেহেতু নারীর যৌন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, সে কারণে পাকিস্তানে এটি এক প্রায় নিষিদ্ধ আলোচনা। স্তন ক্যান্সারকে রোগ হিসেবে না দেখে লোকে একে যৌনতা বিষয়ক কিছু বলে মনে করে।’

এ রোগ থেকে আরোগ্য লাভ এমন রোগীরা জানিয়েছেন, যারই স্তন ক্যান্সার হয়, শারীরিক, আর্থিক এবং মানসিক–সমস্ত ধকল আক্রান্ত ব্যক্তির একলাই সামলাতে হয়। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক সিলভাত জাফরের বয়স যখন ২০, তিনি হঠাৎ আবিষ্কার করলেন তার স্তনের মধ্যে একটি আলাদা মাংস পিন্ড রয়েছে। বাড়ির সবাই তখন ডিজনী ওয়ার্ল্ডে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে, ফলে পরিবারের কাছে প্রকাশ করলেন না ব্যপারটি। ফোলানো নকশা করা, লেস আর কুচি দেয়া জামাকাপড় পড়ে সিলভাত নিজের বুকের ভেতরের বাড়ন্ত মাংসপেশীকে লুকিয়ে রাখতেন। ক্রমে বাড়তে থাকা শারীরিক যন্ত্রনার কথাও কাউকে বলতে পারতেন না।

তিনি বলেন, ‘তাছাড়া আমাদের সমাজে নিজেদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মেয়েরা তেমন একটা কথাবার্তা বলে না।’ নিজের সমস্যা নিয়ে কোনো কথাই বলবে না। আমি ব্রেস্ট ক্যান্সার শব্দটি মুখেই আনতে পারতাম না। আমার মা ছিলেন না, তিনি আগেই মারা গেছেন। ফলে বাড়ির একমাত্র নারী সদস্য হিসেবে আমি চুপ করে ছিলাম।’

পাকিস্তানে ‘স্তন’ কথাটাও প্রকাশ্যে বলা যায় না :
কিন্তু চুপচাপ ৬ মাস কাটিয়ে দেবার পরে, সিলভাত যখন চিকিৎসকের শরনাপন্ন হন, ততদিনে তিনি ক্যান্সারের তৃতীয় ধাপে মানে স্টেজ থ্রিতে পৌঁছে গেছেন। স্তনের ভেতরকার টিউমারটি আকারে বড় হয়েছে, এবং সারা শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। কিন্তু এমন অবস্থা হবার পরেও তার চিকিৎসা কার্যকরভাবে চলছে। পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান স্তন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. হুমা মাজিদ সিলভাতের চিকিৎসা করছেন। লাহোরে ইত্তেফাক হাসপাতালে একটি ক্লিনিক চালান হুমা, যেখানে শত শত স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দেন তিনি।

সিলভাতের চিকিৎসাও তিনি করেছেন। তিনি বলেন, ‘মেয়েরা পরিবারের কথা ভাবে, নিজের কথা কখনো আগে ভাবে না।’ পাকিস্তানি নারী রোগীদের ক্যান্সার চিকিৎসায় প্রধান বাধা ‘লজ্জা’। এছাড়া স্তন যেহেতু শরীরের একটি স্পর্শকাতর প্রত্যঙ্গ, বহু নারী এবং তাদের স্বামী চান না কোন পুরুষ চিকিৎসক নারীদের স্তন পরীক্ষা করে দেখুক। ডা. মাজিদ বলেছেন, এর বাইরে আরো কারণের মধ্যে রয়েছে, সমাজের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো, যার কারণে নারীর স্বাস্থ্যের গুরুত্ব এখনো অনেক কম।

এছাড়া দেশটির বড় শহরগুলো ছাড়া ক্যান্সারের চিকিৎসা সহজে পাওয়া যায় না, যে কারণে অনেক নারী পরিবারের পুরুষ সদস্যের সহযোগিতা ছাড়া চিকিৎসা নিতে পারে না। পাকিস্তানে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত দরিদ্র রোগী বিশেষ করে যারা গ্রামে থাকেন তাদের ভোগান্তি বেশি।

সামাজিক বাধা :
স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত ২০ বছর বয়সী সাবিয়া অপারেশনের পরে প্রথম চেক আপে এসেছেন ডা. মাজিদের কাছে। গত বছর সাবিয়ার বাবা মারা গেছেন। যে কারণ বাড়িতে ভাইবোনদের খরচ যোগানোর জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে একটি চাকরি নিয়েছেন তিনি।বাসে চড়ে আড়াই ঘন্টার যাত্রা করে ক্লিনিকে এসেছেন, এখানে তার চিকিৎসা চলছে, সে কথা দূরে থাক, তার বাড়ির কেউ এখনো জানে না তার স্তন ক্যান্সার হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘খুবই অস্বস্তিকর ব্যপারটা, সবার কাছে বলাও যায় না। আর সবাই জানলে ধরে নিন আপনার আর কোনো বিয়ের প্রস্তাব আসবে না। স্তন ক্যান্সার হয়েছে, এমন কাউকে এ সমাজে কেউ মেনে নেবে না। শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে মানিয়ে চলার পর আপনার ওপর মানসিক নির্যাতন চলবে যে কেনো কোনো বিয়ের প্রস্তাব আসছে না।’

সিলভাতের ক্যান্সার ভালো হয়ে গেছে এক দশকের বেশি সময় আগে, কিন্তু এখনো তার ভালো বিয়ের প্রস্তাব আসে না কেবল এই কারণে। অক্টোবর মাস সারা পৃথিবীতে স্তন ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতার মাস হিসেবে পালিত হয়। পাকিস্তানের পিংক রিবন ফাউন্ডেশন গত ১৫ বছর ধরে স্তন ক্যান্সার নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু অতি সম্প্রতি প্রথমবারের মত তারা খোলাখুলি এ নিয়ে একটি আলোচনা আয়োজন করেছে।

সচেতনতা কর্মসূচি :
লাহোরে একটি স্তন ক্যান্সার হাসপাতাল গঠনের কাজ চলছে, ২০২০ সালে কাজ শুরু হবে সেখানে। উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা, সেখানে চিকিৎসক থেকে শুরু করে সকল কর্মী নারী হবেন। তবে, রোগী, চিকিৎসক, সচেতনতার কাজে নিয়োজিত দাতব্য সংস্থা এবং উদ্যোক্তা সবাই একমত যে এ রোগ নিরাময়ে পাকিস্তানের পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন করতে হবে। অসুখ হলে গোপন না রেখে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে- এটি নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবার বোঝা উচিত। কিন্তু পাকিস্তানে এক্ষেত্রে এখনো পর্যন্ত অগ্রগতি খুবই কম। জীবন বাঁচানোর চেয়ে বিয়েটাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ!

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.