Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সহিংস সংঘর্ষের জেরে আরও একবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মণিপুরের পরিস্থিতি। গত কয়েকদিনে দফায় দফায় গুলি বিনিময়, বোমা বিস্ফোরণ, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা, বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু, মণিপুর রাইফেলসের দু’টি ব্যাটেলিয়নের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্রশস্ত্র লুটের চেষ্টা-সহ একাধিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অবস্থা সামাল দিতে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও যৌথ বাহিনী। খবর বিবিসি বাংলার

এদিকে, শান্তি ফেরানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রতিবাদে নেমেছেন বহু মানুষ। রোববার রাতে বিপুল সংখ্যক নারী ইম্ফলে রাস্তায় নামেন। রাজ্যে শান্তি ফেরানোর পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংয়ের পদত্যাগের দাবি তুলেছেন তারা।

এই আবহে রাজ্যপালের সঙ্গে বৈঠক করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন মণিপুরের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রশাসন সচেষ্ট। সাম্প্রতিক সহিংস সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের পাশে রয়েছে তার রাজ্যের বিজেপি সরকার। নিহত এক ব্যক্তির পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণের টাকাও তুলে দেন তিনি।

মণিপুর পুলিশের কর্মকর্তা কে খাবিব (আইজিপি, ইন্টেলিজেন্স) বলেন, “রাজ্যে সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাগুলির কারণে, মণিপুর পুলিশ যৌথ বাহিনীর সাথে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জেলা সদরে রয়েছেন এবং পরিস্থিতি মনিটর করছেন।”

ড্রোনের সাহায্যে হামলা চালানো হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। পুলিশের সন্দেহ হামলাকারী সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি সম্প্রদায়ভুক্ত। তারপর থেকে রাজ্যের একাধিক জায়গায় হামলা হয়েছে এবং কুকি ও মেইতেই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে বলে অভিযোগ। পুলিশের সঙ্গেও কুকি সম্প্রদায়ের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের সংঘর্ষ হয়েছে বলে অভিযোগ।

দিল্লির মেইতেই আহ্বায়ক কমিটির সেরাম রোজেশ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি কিন্তু খুবই উদ্বেগজনক। আমরা অনুরোধ জানাচ্ছি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে হস্তক্ষেপ করার জন্য। মেইতেই গোষ্ঠীর মানুষের উপর নির্মম অত্যাচার চলছে।”

সাম্প্রতিক সময়ে আক্রমণের জন্য যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা কারা জোগান দিচ্ছে সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কুকি সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা কর্মরত সংগঠনের পক্ষ থেকে হাতজালহই হাওকিপ বলেন, “গত একবছরেরও বেশি সময় ধরে মণিপুরে কুকি গোষ্ঠীর মানুষের উপর যে অত্যাচার চলছে সে বিষয়ে রাষ্ট্র নীরব রয়েছে। আমরা দিল্লিতে কেন্দ্র সরকারকে আমাদের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছি। কিন্তু কিছুই হয়নি। এই মুহূর্তে মণিপুরে যা হচ্ছে তা খুবই চিন্তার। কুকিদের উপর অত্যাচার চলছে এখনও। কিন্তু কেউ কিছু বলছে না।”

ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ভুয়ো পোস্টকে ঘিরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ।

পুলিশকর্তা খাবিব বলেন, “আমি জনসাধারণকে অনুরোধ করব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা দেখছেন তার ভিত্তিতে বিশ্বাস করবেন না। গুঞ্জনে কান দেবেন না। যদি কিছু চোখে পড়ে এবং সেই সম্পর্কে কিছু জানতে চান তাহলে আমাদের কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করুন বা সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং সেলে যোগাযোগ করুন।”

এদিকে, সোমবার সকাল থেকেই অবস্থান বিক্ষোভে শামিল হয়েছেন স্কুল ও কলেজের ছাত্ররা। মণিপুরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করছেন ইম্ফলের পড়ুয়ারা।

কেন আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল মণিপুর?
পুলিশ জানিয়েছে প্রায় চার মাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার পর পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে আবারও সহিংস সংঘর্ষের কারণে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে মণিপুরে। ইম্ফলের কৌত্রুক এলাকায় সশস্ত্র আক্রমণে এক মহিলা-সহ দুইজনের মৃত্যু হয়, আহত হন একাধিক ব্যক্তি।

সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা পাহাড় থেকে কৌত্রুক ও পার্শ্ববর্তী কাদাংবন্দের নিচু এলাকা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। হতাহতের পাশাপাশি বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশেই রয়েছে কুকি জনবহুল পার্বত্য জেলা কাংপোকপি।

অভিযোগ সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা কুকি সম্প্রদায়ভুক্ত। এরপর থেকেই বারে বারে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মণিপুরের পরিস্থিতি।

গত সপ্তাহে মইরাংয়ে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা করা হয় বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় এক বেসামরিক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এর পাশাপাশি মণিপুরের জিরিবাম জেলায় সহিংসতায় চারজন সন্দেহভাজন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য ও এক বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। আসাম সীমান্তবর্তী জিরিবামের মংবুং গ্রামের কাছে এই হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ।

পুলিশ জানিয়েছে জিরিবামে মেইতেই সম্প্রদাইয়ের এক প্রবীণ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এই ঘটনার পর সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়ে।

ওই এলাকায় এখনও উত্তেজনা রয়েছে এবং পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশের দাবি, রাজ্যে সাম্প্রতিক হিংসায় অত্যাধুনিক ড্রোন ও আরপিজি (রকেট চালিত বন্দুক) ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের অস্ত্র সাধারণত যুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হয়।

সেরাম রোজেশ বলেন, “মইরাংয়ে আমার বাড়ি। একটা শান্ত জায়গায় এইভাবে হামলা চালানো হয়েছে ভেবেই শিউরে উঠছি। ঘটনায় যার মৃত্যু হয়েছে তিনি মেইতেইয়ের একজন প্রবীণ সদস্য। তাকে এভাবে প্রাণ দিতে হলো এই বিষয়টা খুবই দুঃখের।”

পুলিশ সন্দেহ করছে যে বোমার বিস্ফোরণে ওই প্রবীণ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে সেটি ছোড়া হয়েছিল সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মাইরেমবাম কোইরেঙের বাড়িকে লক্ষ্য করে। কাছাকাছি একটি জায়গায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ওই প্রবীণ। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়েছে। একাধিক জায়গায় গত সপ্তাহে একইরকমের বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

শুধু তাই নয়, পুলিশ জানিয়েছে ছয়ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মণিপুর রাইফেলসের দু’টি ব্যাটেলিয়নের অস্ত্রাগার লুট করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সেখানে মোতায়েন যৌথ বাহিনী তা রুখতে সমর্থ হয়। হামলাকারীদের রুখতে কাঁদানে গ্যাসের শেল এবং শূন্যে গুলি ছোড়া হয়। এদের মধ্যে একদল হামলাকারী পুলিশের উপর আক্রমণ চালায় যাতে দুজন পুলিশকর্মী আহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব জনজীবনে পড়েছে। রাস্তা-ঘাটে অতিরিক্ত পুলিশ এবং নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে কয়েকদিন। বহু এলাকায় দোকানবাজার বন্ধ রয়েছে।

রোববার রাজ্যপাল এল আচার্যর সঙ্গে দেখা করেন মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং। তার সঙ্গে ছিলেন ১৮ জন বিধায়ক।

এদিকে, সোমবার সকালে ইম্ফলে পুলিশের ডিজি, নিরাপত্তা উপদেষ্টা-সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ইস্তফার দাবিতে রাজভবনের দিকে রওয়ানা দেয় মণিপুরের স্কুল এবং কলেজের কিছু পড়ুয়া। এর পাশাপাশি আধাসামরিক বাহিনী প্রত্যাহার এবং নৈতিক কারণে ৫০ জন বিধায়কের পদত্যাগও দাবি করেন তারা। রাজভবনের সামনে অবস্থান বিক্ষোভও করেন।

ধনমঞ্জরি স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেন, “খাঁচায় থাকা আর ইম্ফলে থাকার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই এই বার্তা বোঝানোর জন্য আমরা মিছিল করছি। কুকিরা জানিয়েছে তাদের কাছে যে অস্ত্র রয়েছে তা দিয়ে তারা ২০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে সমস্ত ক্ষমতা তুলে দিয়ে ইউনিফায়েড কমান্ড জারি করার কথাও জানাচ্ছি।”

অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা দাবি করেও সোচ্চার হয়েছেন অনেকেই। রোববার রাতে বহু নারী রাস্তায় নেমে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তার ইস্তফা দাবি করেছেন।

অন্যদিকে, কুকি সম্প্রদায় এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক সহিংস সংঘর্ষে অত্যাধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার চিন্তার কারণ বলেই পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

আধিপত্যের জেরে শেরপুরে দফার দফায় সংঘর্ষে নিহত ১

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saumya Sarakar serves as an iNews Desk Editor, playing a key role in managing daily news operations and editorial workflows. With over seven years of experience in digital journalism, he specializes in news editing, headline optimization, story coordination, and real-time content updates. His work focuses on accuracy, clarity, and fast-paced newsroom execution, ensuring breaking and developing stories meet editorial standards and audience expectations.