Advertisement

একটি ট্রাকের চাকার পাশে, রাস্তাতেই চাদর বিছিয়ে বানানো হয়েছে অস্থায়ী শোবার জায়গা। একজন সেখানে ঘুমিয়ে আছেন। পাশে জ্বালানো দুটি মশার কয়েল।

Ghum

ঘুমন্ত মানুষটির মাথার নিচে বালিশের বদলে ব্যাগ রাখা। পাশেই দুই লিটারের একটি পানির বোতল। মাঝেমধ্যে মশার কামড়ে ওই ব্যক্তির ঘুম ভাঙছে। মাথা একটু এদিক-ওদিক নাড়িয়ে আবার চোখ বন্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।

রাজধানীর ইসিবি চত্বর পেরিয়ে মিরপুরের কালশীর দিকে যাওয়া মাটিকাটা সড়কে সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনের কাছে আজ রোববার সকাল ছয়টার দিকে দেখা যায় এই দৃশ্য।
সাতসকালেই এই ফিলিং স্টেশনের সামনে ছোট–বড় যানবাহন আর মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন। লাইনে রাতভর অপেক্ষায় থেকে ক্লান্ত হয়ে অনেকেই তখন যে যাঁর মতো ঘুমাচ্ছেন। অনেকে আবার ঘুম ভেঙে খোঁজ নিচ্ছেন জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু হবে কখন।

মোটরসাইকেলে বসে থাকা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ঘুমিয়ে থাকা ওই ব্যক্তির নাম রিফাত খান। তাঁরা চার বন্ধু একসঙ্গে তেল কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। রিফাতের অন্য বন্ধুরা রিমন সরদার, জিসান আহমেদ ও মো. রায়হান। তাঁরাই রিফাতকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিলেন।

রিফাত বলেন, ‘রাতটা খুব খারাপভাবে পার করেছি। গরম আর মশার কামড়ে রাতটা অনেক বাজে গেছে। আমার জীবনে সবচেয়ে খারাপ যদি কোনো রাত হয়ে থাকে, তাহলে সেটা আজকে ছিল। সারা রাত মশা মারা ছাড়া আর কিছুই করি নাই। শুধু মশাই মারসি। আর ঘুম আসলে একটু ঘুমাইসি।’

এত অপেক্ষার পরও কখন তেল পাবেন, ফুল ট্যাংক পাবেন কি না, এ নিয়ে শঙ্কার কথা জানালেন রিফাত।

গতকাল শনিবার বেলা দুইটার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন রিফাত। যখন তাঁর সঙ্গে কথা হয় তখন ঘড়িতে সকাল ছয়টা। ততক্ষণে ১৬ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা জানান, সকাল সাতটার দিকে বিক্রি শুরু হবে।

গতকাল দিবাগত রাত দুইটা থেকে আজ সকাল সাতটা পর্যন্ত রাজধানীর ছয়টি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে গেছে, তবু শেষ হচ্ছে না তেলের জন্য অপেক্ষা। রাতে বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন, আসাদগেটের তালুকদার ও সোনারবাংলা ফিলিং স্টেশন, পরীবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশন, তেজগাঁওয়ের সিটি ফিলিং স্টেশন ও মিরপুরের কালশীর সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলচালিত ছোট-বড় শত শত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।

রাতে শুধু ট্রাস্ট ও তালুকদার এই দুটি ফিলিং স্টেশনে তেল বিক্রি করতে দেখা যায়। এই দুটি পাম্পে নতুন দামে তেল বিক্রি হচ্ছে। অন্য চারটি পাম্পে ওই সময় তেল বিক্রি বন্ধ ছিল। তবে চালু কিংবা বন্ধ, সব ফিলিং স্টেশনেই প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও মোটরসাইকেলের সারি এক কিলোমিটার থেকে আড়াই কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ দেখা গেছে।

অফিস শেষে তেলের লাইনে ১০ ঘণ্টা

বিকেল সাড়ে চারটায় ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন মোহাম্মদ আলিমুজ্জামান। তেল পান সাড়ে ১০ ঘণ্টা পর রাত তিনটার দিকে। আর মিরপুরের কালশীতে বাসায় ফিরতে সাড়ে তিনটা বেজেছে বলে জানান তিনি।

রাত আড়াইটার দিকে যখন আলিমুজ্জামানের সঙ্গে কথা হয়, তখন তিনি ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে ঢোকার মুখে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘অফিস শেষ করে লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখান থেকে তেল নিয়ে বাসায় যাব। বাসায় গিয়ে খাওয়াদাওয়া করব। এর পরে আবার সকালেই অফিসে যেতে হবে।’

অপেক্ষার এই সময়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরপর বাইক এক-দুই মিটার একটু একটু এগিয়েছেন বলে জানান আলিমুজ্জামান। তিনি বলেন, সুবিধাভোগী হয়তো অনেকেই আছেন, কিংবা অনেকে অসদুপায় অবলম্বন করছেন বলেই সাধারণ মানুষের এত ভোগান্তি হচ্ছে।

রাত দুইটার দিকে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, যানবাহনের তিনটি পৃথক সারি। এর মধ্যে সবচেয়ে লম্বা সারি প্রাইভেট কারের। এই সারি প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরের মহাখালী বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত গেছে। আর মোটরসাইকেলের সারি ছিল প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে মহাখালী রেলক্রসিংয়ের কাছাকাছি পর্যন্ত। আর ডিজেলচালিত ভারী যানবাহনের সারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছে।

সরেজমিন দেখা যায়, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকদের কেউ গাড়ির আসনে আধশোয়া হয়ে আছেন। কেউ গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে চা-সিগারেট খাচ্ছেন। কেউবা মুঠোফোনে সময় কাটাচ্ছেন। অনেকে আবার কয়েকজন মিলে জটলা পাকিয়ে গল্প করছেন। যে যাই করুক, বিরক্তি সবার চোখেমুখে। কিছুক্ষণ পরপর একটু করে সামনে এগোচ্ছে লাইন। সঙ্গে সঙ্গেই মোটরসাইকেল ঠেলে সামনে নিচ্ছেন চালকেরা। প্রাইভেট কারের চালকেরা স্টার্ট দিয়ে সামনে এগোচ্ছেন। কেউ আবার তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেক কষ্টে গাড়ি ঠেলে সামনে নিচ্ছেন।

এমন একজন জুরাইনের প্রাইভেট কারের চালক মো. শাহীন। তিনি বলেন, সকালে মহাখালীতে তেলের লাইনে ছিলেন। তখন ওই এলাকার তিনটি পাম্পেই তেল শেষ হয়ে যায়। গাড়িরও তেল শেষ আর তিনি গাড়ি ঠেলছেন বলে জানান। তিনি বললেন, রাত সাড়ে ১১টায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন মহাখালী কলেরা গেটের উল্টো পাশ থেকে। তিন ঘণ্টা দফায় দফায় গাড়ি ঠেলে তিনি এক কিলোমিটারের একটু বেশি এগোতে পেরেছেন। রাত আড়াইটার দিকে তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জাহাঙ্গীর গেট থেকে একটু সামনে ছিলেন।

নতুন মোটরসাইকেল যেন গলার কাঁটা

গত শুক্রবার অনেক শখে একটি মোটরসাইকেল কিনেছিলেন খিলক্ষেতের বড়ুয়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলিফ। সেই মোটরসাইকেলটাকেই এখন গলার কাঁটা মনে হচ্ছে তাঁর। গতকাল রাত দুইটার দিকে কথা হয় এই মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে। ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের তেলের লাইনে তিনি তখন মহাখালী উড়ালসড়কের গোড়ায় ছিলেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন বলেও জানান।

আলিফ বলেন, ‘আমার এহন মনে হইতাসে, গাড়ি তো কিনসি না, নিজের গলায় নিজে একটা কাঁটা বিনধাইসি।’

সেখানেই কথা হয় পাশের আরেক মোটরসাইকেলের চালক শাহরিয়ার সম্রাটের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সরকার যদি তেলের দাম না বাড়াত, তাহলে যারা মজুত করছে তারা ভাবত মজুত করে তো লাভ হচ্ছে না, তখন সবাই মজুত করা বন্ধ করে দিত। এখন অবৈধ মজুতদারেরা আরও বেশি বেশি মজুত করবে।’

সকাল আটটায় আগারগাঁওয়ের হাসান ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম। সেখানে বেলা একটার দিকে তেল আসে, দেড়টার দিকে বিক্রি শুরু হয়। পরে মাত্র দুই ঘণ্টা বিক্রি করার পর সাড়ে তিনটার দিকেই তেল নেই বলে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাই দিনে সাড়ে সাত ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেই তিনি তেল কিনতে পারেননি।

ক্ষোভ জানিয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ওইখানে তারা প্রায় ১২০টির মতো মোটরসাইকেলে তেল দিয়ে আর দেয়নি। তেল তারা সিন্ডিকেট করে আটকে রাখসে। কারণ আজকে দাম বাড়বে তারা জানে।’

বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে আবার লাইনে দাঁড়ান নুরুল ইসলাম। রাত তিনটায় যখন তাঁর সঙ্গে কথা হয়, তখন তাঁর সামনে আরও প্রায় ৩৫টি বাইক ছিল।

ওই সময় তালুকদার পাম্প থেকে তেল কেনার অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের সারি গণভবন মোড় হয়ে জিয়া উদ্যানের পাশে থাকা লেকের মাঝপর্যন্ত চলে গেছে। সারিতে তখন ২৫০টি ব্যক্তিগত গাড়ি, ৩০০ মোটরসাইকেল ছিল।

মালপত্র কিনতে এসে পাম্পেই কাটছে রাত

পরীবাগের মেসার্স মেঘনা ফিলিং স্টেশনে রাত সাড়ে তিনটার দিকে একটি মোটরসাইকেলে দুজন বসে ছিলেন। তাঁদের মোটরসাইকেলের পেছনে দুই পাশে বড় দুটি বস্তা বাঁধা। বললেন, তাঁদের বাসা সাভারের আশুলিয়ার জিরানিবাজারে। গতকাল সকালে ঢাকায় এসেছিলেন দোকানের মালপত্র কিনতে। তাঁদের আসবাবের ব্যবসা রয়েছে।

গাড়ির তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ী আবু বক্কর লাইনে দাঁড়ান দুপুর সাড়ে ১২টায়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফিলিং স্টেশনে তেল দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বললেন, ‘সারা রাত বসে আছি। খুবই কষ্টকর।’

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

আজ সকাল সাড়ে আটটার দিকে কথা হয় আবু বক্করের সঙ্গে। তখন তিনি জানান, সোয়া আটটার দিকে তিনি ৫০০ টাকার তেল পেয়েছেন। তেল নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন তাঁরা।

সূত্র ও ছবি : প্রথম আলো

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.