কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর ভোট ব্যাংক খ্যাত বাগেরহাট-১ (চিতলমারী, মোল্লাহাট, ফকিরহাট) আসনে বড় ধাক্কা খেয়েছে বিএনপি। স্বাধীনতার পর ১৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ১০ বার জয় পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। দুইবার জিতেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে এবার ৫৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

বাগেরহাট-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পান মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক কপিল কৃষ্ণ মন্ডল। তিনি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব এবং অশ্বিনী সেবা আশ্রমের সভাপতিও। পাশাপাশি অতীতে কলাতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। মূলত এ কারণেই স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ তার প্রতি অনাগ্রহী হয়ে পড়ে।
দলীয় সূত্র জানায়, দুঃসময়ে মাঠে থাকা একাধিক নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকলেও দল বহিরাগত একজনকে প্রার্থী করায় ক্ষোভ তৈরি হয়। সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগের ভোট টানার কৌশল হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি নেতাদের।
এদিকে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ এইচ সেলিম এবং আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ রানা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন। দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশ প্রকাশ্যে-গোপনে তাদের পক্ষে কাজ করেন।
ভোটের হিসাব বলছে, মোট ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৬০ ভোটারের আসনে বিজয়ী জামায়াত প্রার্থী মশিউর রহমান খান পান ১ লাখ ১৭ হাজার ৫২৭ ভোট। বিএনপির কপিল কৃষ্ণ মন্ডল পান ১ লাখ ১৪ হাজার ৩২৩ ভোট। ব্যবধান মাত্র ৩ হাজার ২০৪। বিদ্রোহী দুই প্রার্থী সেলিম ও মাসুদ রানা পান যথাক্রমে ৫ হাজার ২৮৩ ও ৬ হাজার ৪৬৭ ভোট। অর্থাৎ ১১ হাজার ৭৫০ ভোটের বড় অংশই ধানের শীষের ভোটব্যাংক থেকে সরে গেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
তিন উপজেলার অন্তত ৩০ জন ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ ভোটের আগেই স্পষ্ট ছিল। অনেকেই বলেন, ‘ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দলকে দিতেই হবে’- ভোটের দিন সেটাই হয়েছে।
বাগেরহাট-২ (সদর-কচুয়া) জেলার গুরুত্বপূর্ণ আসন। অতীতে এ আসনে জয়ী দলই সরকার গঠন করেছে- এমন রাজনৈতিক প্রচলন রয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি এবং ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়।
এবার এখানে জয় পেয়েছে জামায়াত। বিএনপির প্রার্থী ছিলেন শেখ জাকির হোসেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে ছিলেন এম এ এইচ সেলিম। ফলে কর্মী-সমর্থকেরা বিভক্ত হয়ে পড়েন। অনেকে উপরে উপরে বিএনপির পক্ষে কাজ করলেও আড়ালে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে ছিলেন বলে অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, দলীয় কোন্দলের পাশাপাশি চাঁদাবাজি, ঘের-বাড়ি দখল ও ৫ আগস্ট-পরবর্তী লুটপাটের অভিযোগে সাধারণ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়। ভোটের দুই দিন আগ পর্যন্ত বিভিন্ন বাজার ও স্ট্যান্ডে জোরপূর্বক চাঁদা আদায়ের অভিযোগও ওঠে।
তবে বিএনপি প্রার্থী শেখ জাকির হোসেন হারের জন্য বিদ্রোহী প্রার্থী সেলিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও গোপন বৈঠকের কারণেই বিপর্যয় নেমে আসে।
বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পান জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ ঘুরে আসা সোম নাথ দে। তিনি মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সভাপতিও ছিলেন।
দীর্ঘদিন মাঠে কাজ করা দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা তার মনোনয়নে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনি খরচ নিয়ে অসন্তোষ, দলীয় গ্রুপিং এবং মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের অভাবে তিনি হেরে যান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মী বলেন, একটি গ্রুপ জামায়াতের পক্ষে অবস্থান নেয়।
স্থানীয়দের মতে, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন এলাকায় দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে সাধারণ ভোটারদের বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে ফলাফলে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
বিএনপির পরাজয়ের এই তিনটি আসনের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- বিদ্রোহী প্রার্থী, দলীয় কোন্দল, আ.লীগ ঘুরে আসা প্রার্থীকে মনোনয়ন, মাঠপর্যায়ে অসন্তোষ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ- এই পাঁচ কারণেই বিএনপির ভরাডুবি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে সংগঠিত ভোটব্যবস্থা ও কৌশলগত প্রার্থী নির্বাচনের কারণে লাভবান হয়েছে জামায়াত।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


