প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও তিনি একজন মার্জিত, কঠোর পরিশ্রমী এবং ভদ্র মানুষ হিসেবে পরিচিত। অথচ সেই কিয়ার স্টারমারই আধুনিক রাজনৈতিক জনমত জরিপের ইতিহাসে ব্রিটেনের সবচেয়ে অপছন্দের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আজ বিদায় নিলেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে হাউস অব কমন্সে ৪১১টি আসনে জিতে, ১৭৪ আসনের এক বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ডাউনিং স্ট্রিটে পা রেখেছিলেন তিনি।

টনি ব্লেয়ারের ১৯৯৭ ও ২০০১ সালের ভূমিধ্বস বিজয়ের পর এটিই ছিল লেবার পার্টির সবচেয়ে বড় জয়। উল্লাসরত জনতার উদ্দেশে সেদিন স্টারমার বলেছিলেন, ব্রিটেন এখন ‘তার ভবিষ্যৎ ফিরে পাওয়ার’ সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় আজ সোমবার সেই স্টারমারকেই চরম অপমান আর ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে হলো। কিন্তু কেন এই নজিরবিহীন পতন? রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জনমত জরিপের খতিয়ান খতিয়ে দেখলে পাঁচটি প্রধান কারণ সামনে আসে:
‘মাইনাস ৬৬’ রেটিং: লিজ ট্রাসের চেয়েও নিচে পতন
২০২৪ সালের সেই ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে একটি বড় ফাঁকি ছিল, লেবার পার্টি আসন সংখ্যায় ঝড় তুললেও সামগ্রিকভাবে মাত্র ৩৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, যা দলটির জনপ্রিয়তার দুর্বল ভিত্তিকে স্পষ্ট করেছিল। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র এক বছরের মাথায় জরিপ সংস্থা ইপসোসের সমীক্ষায় স্টারমারের নেট সন্তুষ্টির রেটিং নেমে যায় মাইনাস ৬৬-তে, যা ১৯৭৭ সালের পর থেকে ব্রিটেনের যে কোনো প্রধানমন্ত্রীর জন্য সর্বনিম্ন। বর্তমানেও এই রেটিং মাইনাস ৬০-এর কাছাকাছি। মাত্র ১৬ শতাংশ মানুষ তাঁর পক্ষে কথা বলছেন, যেখানে ৭৬ শতাংশ মানুষই তাঁর ওপর চরম অসন্তুষ্ট। এমনকি মাত্র ৪৯ দিন ক্ষমতায় থাকা এবং ‘লেটুস পাতার চেয়েও কম স্থায়িত্ব’ বলে ট্রল হওয়া কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের রেটিংও কখনো মাইনাস ৫১-এর নিচে নামেনি। স্টারমার জনপ্রিয়তায় তাঁকেও ছাড়িয়ে গেছেন।
রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব ও ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’
আইন পেশার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা স্টারমার ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের প্রধান হিসেবে অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক ও কৌশলী আইনজীবী ছিলেন। কিন্তু রাজনীতিতে তিনি ছিলেন তুলনামূলক নতুন। স্ট্রাথক্লাইড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং ব্রিটেনের সবচেয়ে সম্মানিত ভোট-বিশ্লেষক জন কার্টিস আল জাজিরাকে বলেন, স্টারমার একজন অত্যন্ত চতুর আইনজীবী হতে পারেন, কিন্তু তাঁর ভেতরে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও একজন নেতার ব্যক্তিত্বের অভাব ছিল। তিনি লেবার পার্টি বা নিজের রাজনৈতিক আদর্শকে জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে পারেননি। দেশের জন্য তাঁর দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য বা রূপকল্প কী, তা নিয়ে কোনো গল্প বা সঠিক দিকনির্দেশনা তিনি দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। লন্ডন কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক টিম বেলও তাঁকে একজন অত্যন্ত ‘দুর্বল বক্তা ও যোগাযোগে অক্ষম’ নেতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ভুল অর্থনৈতিক নীতি ও বারবার ‘ইউ-টার্ন’
কনজারভেটিভদের এক দশকেরও বেশি শাসনের পর এক চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে ক্ষমতা নিয়েছিলেন স্টারমার। জীবনযাত্রার লাগামহীন খরচ, খালি কোষাগার আর উপচে পড়া কারাগারের সমস্যা ছিল তাঁর সামনে। লেবার পার্টির ওপর যেন ‘অর্থনীতি ধ্বংসকারী’ তকমা না পড়ে, সেজন্য স্টারমার রক্ষণশীলদের মতো কঠোর বাজেট নীতি বেছে নেন। কিন্তু তাঁর প্রথম বড় ভুল ছিল, শীতকালে বয়স্কদের ঘর গরম রাখার জন্য দেওয়া ‘উইন্টার ফুয়েল অ্যালাউন্স’ বা জ্বালানি ভাতা কেটে নেওয়া।
সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভের মুখে সরকার পরে এই সিদ্ধান্ত থেকে ‘ইউ-টার্ন’ বা পিছু হটতে বাধ্য হলেও স্টারমারের ভাবমূর্তি ততক্ষণে ধুলোয় মিশে যায়। এরপর ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে প্রতিবন্ধী ভাতার ওপর পরিকল্পিত কর্তন বাতিলের দাবিতে দলের ভেতরেই বিদ্রোহ শুরু হয়, যেখানে ক্ষুব্ধ ৪৯ জন লেবার এমপি খোদ স্টারমার সরকারের বিরুদ্ধেই ভোট দেন। কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক আনন্দ মেনন বলেন, “স্টারমার ভেবেছিলেন রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আনলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি দেশের জন্য প্রয়োজনীয় সাহসী অর্থনৈতিক সংস্কারের গুরুত্বই বোঝেননি।”
জেফরি এপস্টেইনের বন্ধুর ‘দূত’ নিয়োগ কেলেঙ্কারি
স্টারমারের সততার ইমেজে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে যখন তিনি কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের বিতর্কিত বন্ধু পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন। ম্যান্ডেলসন এর আগে লেবার পার্টির অন্য দুটি সরকার থেকেও নৈতিক স্খলনের কারণে বরখাস্ত হয়েছিলেন। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও ফরেন অফিস এই নিয়োগ অনুমোদন দেওয়ায় এবং পরবর্তীতে স্টারমার ভুক্তভোগীদের কাছে ক্ষমা চাইলেও ততদিনে ডাউনিং স্ট্রিটের নৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
নাইজেল ফারাজের উত্থান ও অ্যান্ডি বার্নহামের রাজনৈতিক চাল
স্টারমারের এই একের পর এক ভুলের সুযোগ নিয়ে গত মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে ব্যাপক জয় পায় অভিবাসন-বিরোধী দল ‘রিফর্ম ইউকে’ এবং এর পপুলিস্ট নেতা নাইজেল ফারাজ। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে ফারাজের এই দ্রুত উত্থান দেখে লেবার এমপিরা ভয় পেয়ে যান যে আগামী নির্বাচনে তারা আসন হারাবেন। দলের ভেতরে অসন্তোষ এতটাই বাড়ে যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার গোপনে স্টারমারকে বিদায়ের সময়সূচি ঠিক করার চাপ দেন। গত ১৪ মে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন উচ্চাভিলাষী স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
ঠিক এই সময়েই দৃশ্যপটে হাজির হন ব্রিটিশ মিডিয়ার দেওয়া ‘কিং অব দ্য নর্থ’ খ্যাত ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় লেবার মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আইনি শর্ত পূরণের জন্য বার্নহামকে প্রথমে পার্লামেন্ট সদস্য হতে হতো। স্টারমার প্রথমে তাঁকে উপ-নির্বাচনে দাঁড়াতে বাধা দিলেও পরে দলের চাপে বাধ্য হন। গত বৃহস্পতিবার মেকারফিল্ড আসনের উপ-নির্বাচনে ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে বার্নহাম এক বিশাল জয় তুলে নেন এবং আজ সোমবার এমপি হিসেবে শপথ নেন। নিজের আসন বাঁচানোর তাগিদে লেবার এমপিদের কাছে স্টারমারের চেয়ে বার্নহাম অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও দূরদর্শী নেতা হয়ে ওঠেন। ফলে নিজের গদি ও দল বাঁচাতে পদত্যাগ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না কিয়ার স্টারমারের সামনে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



