আগামী জাতীয় নির্বাচনে কোনো ধরনের কারসাজি বা ‘মেকানিজম’ করার চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্টদের পালাতে বাধ্য হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সেলিব্রেটি হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। সাবেক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সম্মানে ‘ইন রিকগনিশন অব সার্ভিস অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস: অ্যা স্যালুট টু আওয়ার ডিস্টিংগুইশড ভেটেরানস’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে জামায়াত আমির বলেন, অতীতের তিন বা চারটি নির্বাচনের মতো কোনো নির্বাচন জনগণ আর দেখতে চায় না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বোঝাপড়ার নির্বাচন নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি ভোটারদের সম্পর্কের ভিত্তিতেই নির্বাচন হতে হবে। জনগণ যেভাবে ভোট দিতে চায়, সেভাবেই ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সবাই যদি সচেতন থাকে, তাহলে কেউ যদি নির্বাচনে কারচুপির চিন্তাও করে, ইনশাআল্লাহ তাকে পালাতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশ বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে এবং এই মুহূর্তে জাতীয় জীবনে আসন্ন নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম।
তিনি বলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন কোনো গ্রহণযোগ্য কাঠামোর মধ্যেই পড়ে না। এমন একটি প্রজন্ম রয়েছে, যাদের বয়স এখন ৩৫–৩৬ বছর, অথচ তারা জীবনে একবারও ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
জামায়াত এমন একটি নির্বাচন চায় যেখানে প্রতিটি ভোটার নির্ভয়ে ও স্বস্তির সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে এবং ভোট দেওয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহের অবকাশ থাকবে না। এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য।
আগামী নির্বাচনকে ‘আইকনিক নির্বাচন’ হিসেবে দেখতে চায় জামায়াত—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ও নির্বাচন কমিশন যে আশ্বাস দিয়েছে, তা কেবল বক্তব্যে নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। এজন্য প্রতিটি ভোটকেন্দ্র ও ভোটিং বুথে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের ওপর তিনি জোর দেন। তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এ বিষয়ে অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। এর বাইরে আরও কত টাকা লুট হয়েছে, তার সঠিক হিসাব নেই। দেশ আসলে দরিদ্র নয়; চুরি ও দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে দেশ দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে।
তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনে ৫০০ কিংবা ১০০০ কোটি টাকা খরচ হলেও তা করা উচিত। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচনই সুশাসনের ভিত্তি। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঘাটতি থাকলেও সেটি অনেকটাই পূরণ হবে।
সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ভোট দেওয়ার সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করা—এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, জনগণ যাকে পছন্দ করবে তাকে ভোট দেবে, কিন্তু সেই সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। এখন পর্যন্ত তা নিশ্চিত হয়নি, তবে এটি করতেই হবে। কেউ যদি দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, তাহলে তার সরে দাঁড়ানো উচিত। দায়িত্ব নিয়ে কাজ না করা শুধু অবহেলা নয়, বরং দায়িত্ব লঙ্ঘনের শামিল।
মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে সাবেক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা কোনো বেসামরিক ব্যক্তির কণ্ঠে নয়, বরং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমেই জাতির কাছে পৌঁছেছিল। তিনি বলেন, এ জন্য তারা বিশেষ সম্মানের দাবিদার এবং ইতিহাস এভাবেই লেখা থাকবে।
তিনি আরও বলেন, রাজনীতিবিদরা সময়মতো দায়িত্ব পালন করলে সেনাবাহিনীর একজন অফিসারকে এগিয়ে আসতে হতো না। সেই ঐতিহাসিক অবদান অস্বীকার করা মানে জাতির ইতিহাসকেই অস্বীকার করা।
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। একইভাবে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আ স ম আব্দুর রবের নামও অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। যার যেখানে অবদান, তার স্বীকৃতি না দিলে ভবিষ্যতে দেশ নতুন বীর জন্ম দিতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চব্বিশের আন্দোলনের সময় সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে দেশ গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু বর্তমানে কর্মরত সদস্যরাই নয়, অবসরপ্রাপ্ত বা জোরপূর্বক অবসরে পাঠানো সদস্যদের ভূমিকাও ছিল সাহসী ও দায়িত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, সেই সময় রাওয়া ক্লাবে অনুষ্ঠিত প্রেস কনফারেন্স এবং মিরপুর ডিওএইচএসে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দৃঢ় অবস্থান জাতিকে সঠিক পথ দেখিয়েছিল।
ন্যায়বিচার প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, গরিব বলেই কেউ বিচার পাবে না—এটা হতে দেওয়া যাবে না। এক মুক্তিযোদ্ধার মেয়েকে নির্যাতনের মাধ্যমে জীবন ধ্বংস করে হত্যার পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, অথচ আজও তার বিচার হয়নি। এসব বিচার এখনো চোরাবালিতে আটকে আছে।
তিনি বলেন, দুর্নীতির ডালপালা নয়, মূল শিকড় ধরেই টান দিতে হবে। শুধু লেজ ধরে টানাটানি করলে হবে না, কান ধরে টান দেওয়ার সময় এসেছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মেজর জেনারেল মাহবুব উল আলম ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন জামায়াতের ঢাকা–১৬ আসনের প্রার্থী আব্দুল বাতেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কর্নেল (অব.) মো. জাকারিয়া হোসেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম, প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইনসহ অনেকে। অনুষ্ঠানে সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় সাড়ে তিনশ থেকে চারশ সাবেক সদস্য অংশ নেন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


