মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করা। আর এই সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম পথ হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত ফয়সালা ও সিদ্ধান্তের প্রতি মন থেকে সন্তুষ্ট থাকা এবং তা সাদরে গ্রহণ করা। আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি একজন বান্দার মনোভাব কেমন হওয়া উচিত—সে বিষয়েই নিচে আলোচনা করা হলো।

আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির অর্থ
আল্লামা ইবনে আতা (রহ.) বলেন, আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি বলতে বোঝায়—আল্লাহ তাআলা অনাদি কাল থেকেই বান্দার জন্য যা নির্ধারণ করে রেখেছেন, তার প্রতি অন্তরের প্রশান্তি ও তৃপ্তি অনুভব করা।
কারণ একজন মুমিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার জন্য সর্বোত্তম বিষয়ই নির্ধারণ করেন। এই বিশ্বাস থেকেই বান্দার অন্তরে সন্তুষ্টি জন্ম নেয়।
(সালাহুল উম্মতে : ৪/৪৯৩)
আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির গুরুত্ব
আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা বান্দার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই সন্তুষ্টির মাধ্যমেই বান্দা আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,
‘আদম সন্তানের সৌভাগ্য হলো—আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকা। আর দুর্ভাগ্য হলো—আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা থেকে বিরত থাকা এবং তাঁর ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়া।’
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২১৫১)
আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির ধরন
বান্দার আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি মূলত তিনভাবে প্রকাশ পায়—
১. আল্লাহকে রব ও ইলাহ হিসেবে মেনে সন্তুষ্ট থাকা
এটি হলো আল্লাহর একত্বে পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখা এবং প্রকাশ্যে বা গোপনে কাউকে তাঁর সঙ্গে শরিক না করা। বিশুদ্ধ ঈমানের মাধ্যমেই এই সন্তুষ্টি প্রতিফলিত হয়।
২. আল্লাহর ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্ট থাকা
অর্থাৎ আল্লাহর সিদ্ধান্ত, প্রজ্ঞা ও পরিচালনায় সন্তুষ্ট থাকা এবং বিশ্বাস করা—আল্লাহ কখনোই বান্দার প্রতি অবিচার করেন না; বরং সবকিছুতেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আল্লাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করার মাধ্যমেই এই সন্তুষ্টি প্রকাশ পায়।
৩. আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরে সন্তুষ্ট থাকা
জীবনের সুখ–দুঃখ, লাভ–ক্ষতি, সাফল্য–ব্যর্থতা সবকিছুকে আল্লাহর পক্ষ থেকে মেনে নেওয়া এবং তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না করা। ধৈর্য ও দৃঢ় বিশ্বাসের মাধ্যমে এই সন্তুষ্টি প্রকাশ পায়।
আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির বিধান
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বান্দার ওপর আরোপিত নির্দেশ ও নির্ধারণ মূলত দুই ধরনের—
এক. দ্বিনি বা শরয়ি বিধান
দুই. জাগতিক বা তাকদিরগত নির্ধারণ
দ্বিনি বিধান মানা ও পালন করা বান্দার জন্য অবশ্যকর্তব্য। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে কোনো মুমিন পুরুষ বা নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণের অধিকার নেই।’
(সুরা আহজাব : ৩৬)
আর জাগতিক নির্ধারণ—যেমন রোগ, বিপদ, কষ্ট ইত্যাদি—এসবের ক্ষেত্রে সন্তুষ্ট থাকার বিধান পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। কখনো তা ওয়াজিব, কখনো সুন্নত বা মুস্তাহাব। তবে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার পর তাতে সন্তুষ্ট থাকা সম্পূর্ণ হারাম।
আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকার উপায়
জ্ঞানী ও বুজুর্গ আলেমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আমলের কথা উল্লেখ করেছেন—
১. আল্লাহর আদেশ মানতে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা
২. নিজের সব বিষয় আল্লাহর হাতে সোপর্দ করা
৩. আল্লাহর সিদ্ধান্ত যে অনিবার্য—এ বিশ্বাস দৃঢ় করা
৪. আল্লাহই বান্দার জন্য সর্বাধিক কল্যাণকামী—এই ধারণা পোষণ করা
৫. বিপদে আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদানের আশা রাখা
৬. সন্তুষ্টির জন্য নিয়মিত দোয়া করা
সবর ও সন্তুষ্টির সম্পর্ক
বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টিরই একটি রূপ। উমর (রা.) বলেন,
‘সব কল্যাণ সন্তুষ্টির মধ্যেই নিহিত। যদি সন্তুষ্ট থাকতে না পারো, তবে অন্তত ধৈর্য ধারণ করো।’
(মাজমুউ ফাতাওয়া : ১০/৬৮৮)
স্বাভাবিক কষ্ট সন্তুষ্টির পরিপন্থী নয়
আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকার অর্থ এই নয় যে, মানুষের কষ্ট, দুঃখ বা বেদনা অনুভব হবে না। বরং শর্ত হলো—এসব অনুভূতির ওপর আল্লাহর নির্দেশকে প্রাধান্য দেওয়া।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের ঘটনা আমাদের জন্য অনুকরণীয়। তিনি তাঁর সন্তান ইবরাহিম (রা.)-এর ইন্তেকালে অশ্রু ঝরিয়েছিলেন, তবে মুখে এমন কিছু বলেননি যা আল্লাহর অপছন্দনীয়।
(সহিহ বুখারি : ১৩০৩)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


