আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম রোজা। যুগে যুগে মানুষের হেদায়েতের জন্য প্রেরিত প্রত্যেক নবী-রসুলের ওপর রোজা ফরজ ছিল। সংখ্যা ভিন্ন ছিল, পদ্ধতি ভিন্ন ছিল-কিন্তু লক্ষ্য ছিল একটাই: আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম সাধনা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’( সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩।)

রোজা

Advertisement

এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- রোজা কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণার নাম নয়; এটি আত্মা পরিশুদ্ধ করার সাধনা, অন্তরকে আল্লাহভীতিতে আলোকিত করার এক মহিমান্বিত পথ। রোজা এমন এক ইবাদত, যার প্রকৃত উদ্দেশ্য একমাত্র স্রষ্টার সন্তুষ্টি। মানুষ নামাজ পড়লে অন্যে দেখে, দান করলে মানুষ জানে; কিন্তু রোজা-বান্দা ও তার রবের মাঝে এক পবিত্র, নিভৃত ও গভীর ভালোবাসার বন্ধন। যেখানে নেই লোকদেখানো কিছু, নেই কৃত্রিমতা-আছে শুধু আন্তরিকতা, সংযম ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাঙ্ক্ষা। সারা দিন উপোস থেকে সন্ধ্যায় ইফতার করা এ কেবল সেই বান্দার পক্ষেই সম্ভব, যে আল্লাহকে গভীরভাবে ভালোবাসে। এ কারণেই আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘আস-সাওমু লি ওয়া আনা আজযি বিহি। ‘রোজা আমার জন্য, আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।’ ( বুখারি, ১৯০৪; মুসলিম ১১৫১।) হাদিসের একটি অংশ হলো, ‘আসসাওমু লি ওয়া আনা আযজিবিহি।’ এর অর্থ সাধারণত করা হয়, ‘রোজা আমার জন্য, আমিই রোজার পুরস্কার দেব।’ তবে আলিফের ওপর পেশ দিয়ে উযজা উচ্চারণও হয়ে থাকে। তখন অর্থ দাঁড়াবে- ‘আমি নিজেই রোজার প্রতিদান বা পুরস্কার হিসেবে বান্দার কাছে ধরা দেব।’ তরিকতের ইমাম ও সুফিদের কাছে এ অর্থটিই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁদের মতে, রোজার আসল সওয়াব জান্নাতের হুর-গেলমান নয়, বরং রোজাদারের জন্য আসল পুরস্কার হলো দিদারে এলাহি বা আল্লাহর দিদার। ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, রোজার পুরস্কার সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, ‘কামনাবাসনা বিসর্জনকারীদের আল্লাহ বেহিসাব প্রতিদান দেবেন।’ (সুরা জুমার, আয়াত ১০)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেন, কামনাবাসনা বিসর্জনকারী বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে এ নিয়ে কয়েকটি মত পাওয়া যায়। কেউ বলেছেন, তারা হলো হিজরতকারী। কেউ বলেছেন, তারা হলো বিপদে সবরকারী। কেউ বলেছেন, তারা হলো নেক আমলকারী। কেউ বলেছেন, যারা অত্যাচারের মুখে ধর্মে অবিচল থেকেছে। আর সুফিদের কেউ কেউ বলেছেন, তারা হলো রোজা পালনকারী। রোজা পালনকারী বলতে এখানে শুধু সকাল-সন্ধ্যা না খেয়ে থাকা নয় বরং জীবনব্যাপী যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন এমন হাকিকি রোজাদারদের কথা বলা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে রোজাদার আর সবরকারী একই গুণসম্পন্ন ব্যক্তি। হজরত আলী (রা.) বলেন, কেয়ামতের দিন সব নেক আমলের প্রতিদান দেওয়া হবে মেপে মেপে। কিন্তু যারা কামনাবাসনা বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর জন্য ধৈর্যধারণ করেছেন তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে মাপ ছাড়া অসীম।

ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, মূলত সব ইবাদতই আল্লাহর জন্য করা হয়। কিন্তু তিনি শুধু রোজাকে নিজের জন্য বলেছেন। এ থেকে বোঝা যায় অন্য সব ইবাদতের চেয়ে দামি ইবাদত হলো রোজা। যে কারণে তিনি বলেছেন, রোজা আমার জন্য। শুধু তা-ই নয়, সব ইবাদতের পুরস্কার আল্লাহই দেবেন কিন্তু তার পরও রোজার বিষয়টি তিনি আলাদা করে বলেছেন, রোজার পুরস্কার আমি দেব। মূলত একটি কারণে আল্লাহ রোজাকে নিজের বলেছেন এবং নিজে পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। কারণটি হলো, রোজা মানেই হলো মনের ভিতর থেকে দুনিয়ার কামনাবাসনা লোভ বিসর্জন দেওয়া। যার সম্পর্ক শুধুই অন্তরের সঙ্গে।

কী অপার সম্মান! রোজার প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ দেবেন-এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে? তাই রমজানের রোজা হলো আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার মোক্ষম সুযোগ। এ মাস রহমতের, ক্ষমার, নাজাতের। এ মাসে একটি সৎকর্মের প্রতিদান বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। অতএব রমজান আমাদের জন্য কেবল একটি মাস নয়-এটি আত্মশুদ্ধির ঋতু, ভালোবাসা ফিরে পাওয়ার সময়, আল্লাহর দরবারে ফিরে আসার আহ্বান। অন্য হাদিসে রোজার প্রতিদান সম্পর্কে রসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি, ৩৮; মুসলিম ৭৬০।) আসুন, আমরা রমজানের প্রতিটি রোজাকে জীবনের নতুন সূচনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে রমজানের রোজাগুলো যথাযথভাবে পালন করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক :মাওলানা আল আমিন সরকার

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.