সাইফুল ইসলাম : বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে নারী পাচারের অভিযোগ উঠেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী এক বাংলাদেশি যুবকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের কম বয়সী ও অসহায় নারীদের ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে প্রথমে ভারতে নিয়ে যান। পরে দূতাবাসে (এম্বাসি) সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার কথা বলে তাদের বিক্রি করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধানে চক্রটির এক সদস্য হিসেবে নারায়ন সরকারের নাম উঠে এসেছে।

অভিযুক্ত নারায়ন সরকার মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার হাটিপাড়া ইউনিয়নের মৃত বুদ্ধেশ্বর সরকারের ছেলে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১৫ বছর আগে এলাকা ছেড়ে চলে যান তিনি। এরপর থেকে তিনি এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন না। বর্তমানে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলায় থাকেন বলে জানা গেছে।
হাটিপাড়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, প্রায় ১৫ বছর আগে হাটিপাড়া বাজারে একটি দোকান পরিচালনা করতেন নারায়ন। সে সময় সিগারেটভর্তি একটি ট্রাক লুটের ঘটনায় তার নাম জড়ানোর পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এছাড়া এলাকার বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এরপর দীর্ঘদিন তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি তাকে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দেখা যায়।
এই প্রতিবেদকের প্রশ্নের মুখে প্রথমে নিজেকে হাটিপাড়ার বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দেন নারায়ন সরকার। পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, বর্তমানে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলায় বসবাস করেন এবং সেখানে কাপড়ের ব্যবসা করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করে নারায়ন সরকার বাংলাদেশের দরিদ্র ও অসহায় তরুণীদের টার্গেট করতেন। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা কম বয়সী মেয়েদের বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি মানিকগঞ্জে অবস্থানের সময় নারায়ন সরকার দাবি করেন, তিনি আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। তিনি বলেন, হাটিপাড়ায় তার মামা-খালার বাড়ি রয়েছে এবং প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর আগে হাটিপাড়া বাজারে তার একটি দোকান ছিল। তিনি তার দুই মামার নাম সুকুমার ও শ্রীদাম বলে উল্লেখ করেন।
প্রথমে কলকাতায় কাপড়ের ব্যবসা করার কথা বললেও পরে তিনি দাবি করেন, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর কাজও করেন। তবে কোন প্রতিষ্ঠান বা অফিসের মাধ্যমে এ কাজ করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম বা ঠিকানা দেখাতে পারেননি। এ সময় তিনি দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
নারায়ন সরকার দাবি করেন, মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের রাজ আবাসিক হোটেলের মালিক আব্দুর রহমান ও রাজীব নামে দুই ব্যক্তির সঙ্গে ভিসা-সংক্রান্ত কাজে দেখা করতে তিনি মানিকগঞ্জে এসেছেন। তিনি আরও বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তার রয়েছে এবং সেটি দিয়ে রাজ আবাসিক হোটেলে নাম নিবন্ধন করেছেন।
তবে অনুসন্ধানে রাজ আবাসিক হোটেলের রেজিস্টার পর্যালোচনা করে গত কয়েক দিনের তালিকায় নারায়ন সরকার নামে কোনো অতিথির নাম পাওয়া যায়নি।
রাজ আবাসিক হোটেলের মালিক আব্দুর রহমান বলেন, “নারায়ন সরকার আগে পাঁচ-ছয় মাস পরপর আমাদের হোটেলে আসতেন এবং কয়েকদিন অবস্থান করতেন। প্রায় ছয় মাস আগে তিনি এখানে ছিলেন। তখন এখান থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর আর আসেননি। শুনেছি তিনি বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত। নারী পাচারের বিষয়েও আভাস পেয়েছি।”
হোটেলটির ব্যবস্থাপক মো. লিয়াকত মিয়া বলেন, “তিনি দীর্ঘদিন আমাদের হোটেলে থেকেছেন। মাঝেমধ্যে ঢাকায় যেতেন বলে শুনেছি। আমাদের কাছে বলেছিলেন, ভারতে তার বাড়িঘর ও অনেক সম্পদ রয়েছে। তবে দেশে থাকা মা, স্ত্রী ও সন্তানের খোঁজখবর নেন না বলেও শুনেছি।”
মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের রাজ আবাসিক হোটেল এলাকার এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নারায়ন কলকাতায় থাকেন এবং কয়েক মাস পরপর বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন মেয়েকে বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দেন। ওই ব্যবসায়ীর দাবি, একবার নারায়ন তার কাছে কম বয়সী মেয়েদের খোঁজ চেয়েছিলেন। সুন্দরী মেয়ে হলে দুই লাখ টাকা এবং অপেক্ষাকৃত কম সুন্দরী হলে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে তিনি জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুতে মানিকগঞ্জের একটি সিআর মামলায় পুলিশ নারায়ন সরকারকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি নির্দিষ্ট কোনো স্থানে অবস্থান করেন না এবং বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ান। বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেছে সূত্রটি।
অভিযুক্তের মামা সুকুমার সরকার বলেন, “অনেক বছর আগে নারায়ন হাটিপাড়া বাজারে দোকান করতো। পরে অনেক টাকার সিগারেট ও বিভিন্ন মানুষের টাকা আত্মসাতের অভিযোগের পর সে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। বর্তমানে সে কোথায় থাকে বা কী করে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণা নেই। এমনকি অসুস্থ মা ও নিজের স্ত্রী-সন্তানেরও খোঁজখবর নেয় না সে।”
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন বলেন, “কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অভিযোগ করলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া নারী পাচারের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলেও তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



