চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আরব আমিরাত ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপিওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতিতে ছয় দিন অচল অবস্থায় ছিল বন্দর। এতে বন্দরের জেটি, টার্মিনাল, শেড ও ইয়ার্ডে পণ্যবাহী কনটেইনার জমে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। লোকসান গুনতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের।

তবে সবশেষ বন্দরে লাগাতার কর্মবিরতি দুই দিনের জন্য স্থগিত করেছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকালে বন্দর ভবনে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর। এ সময় নৌ উপদেষ্টার আশ্বাস অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী রবিবার থেকে আবার কর্মবিরতি কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দেন তিনি।
গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) থেকে শুরু হওয়া কর্মবিরতি বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত ছয় দিনে গড়ানোর পর এ সিদ্ধান্ত এলো। এর মধ্যে প্রথম তিন দিন ছিল আট ঘণ্টা করে এবং গত মঙ্গলবার ও বুধবার এবং সবশেষ বৃহস্পতিবার পুরোদমে চলেছে কর্মবিরতি।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরে না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। বন্দরের শ্রমিকরা এই কর্মবিরতি পালন করছেন। কিন্তু সরকার সমাধানের কোনও উদ্যোগ নিচ্ছে না।’
বৃহস্পতিবার বিকালে উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের কথা তুলে ধরে ইব্রাহীম খোকন বলেন, ‘উপদেষ্টা মহোদয়ের সঙ্গে বৈঠকে আমরা চারটি দাবি জানিয়েছি। এই চারটি হলো নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপিওয়ার্ল্ডকে দেওয়া যাবে না। কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। বন্দর চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানের পদত্যাগও দাবি করেছি আমরা। দাবি না মানলে আগামী রবিবার থেকে কর্মবিরতি চলবে।’
বন্দরে জমেছে কনটেইনারের স্তূপ
কর্মবিরতির কারণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে বন্দর। মঙ্গলবার ও বুধবার কোনও কনটেইনার ডেলিভারি হয়নি। ৫৯ হাজার কনটেইনার ধারণক্ষমতার বন্দরে বর্তমানে ৩৭ হাজার ৩১২টি কনটেইনার জমা পড়েছে। বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতে রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনারের স্তূপ আরও বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্দরের অভ্যন্তরে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি); এই তিনটি মূল টার্মিনালেই কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছে। জেটিতে থাকা ১১টি জাহাজের ক্রেন গুটিয়ে রাখা হয়েছে। গ্যান্ট্রি ক্রেনের বুমগুলোও (কনটেইনার তোলার হাতল) ওপরে তুলে রাখা হয়।
বেড়েছে জাহাজের জট
বন্দরের জেটি ও বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় আছে ৯৮টি জাহাজ। এসব জাহাজের মধ্যে কনটেইনার জাহাজ আছে ১২টি। জেনারেল কার্গো আছে ২৯টি। খাদ্যসামগ্রী বোঝাই জাহাজ আছে ২২টি। চিনি বোঝাই পাঁচটি ও লবণ বোঝাই জাহাজ আছে দুটি। বাকিগুলো পাথরসহ অন্যান্য সামগ্রী বোঝাই। আগামী এক সপ্তাহে আরও এক ডজনের বেশি জাহাজ নোঙর করবে। কর্মবিরতি থাকলে রমজানের আগে জাহাজ জট তীব্র হবে।
আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে বন্দরের মূল তিনটি টার্মিনাল থেকে কোনও জাহাজ ছেড়ে যেতে পারেনি। নতুন কোনও জাহাজ ভেড়াও সম্ভব হয়নি। বর্তমানে জেটিতে কনটেইনারবাহী ১০টি এবং কনটেইনারবিহীন পণ্যবাহী তিনটি জাহাজ আটকে আছে। রফতানি পণ্যবাহী কোনও কনটেইনার বন্দরে ঢুকতে পারছে না এবং আমদানি পণ্যও খালাস হচ্ছে না।
পোশাক খাতে বড় ধরনের ক্ষতির শঙ্কা ব্যবসায়ীদের
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারর্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কর্মবিরতির কারণে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সামনে নির্বাচনের ছুটি। এ অবস্থা চলতে থাকলে রফতাানি কনটেইনার রেখে বন্দর ছেড়ে যাবে অনেক বড় জাহাজ। তখন অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে পোশাক খাত। এই ব্যাপারে দায়িত্বশীলদের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
২১ বেসরকারি ডিপোতো জমেছে ১১ হাজার রফতানি পণ্যের কনটেইনার
বন্দর দিয়ে রফতানি হওয়া কনটেইনারগুলোর ব্যবস্থাপনা করে চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোা। সব প্রক্রিয়া শেষে ডিপো থেকেই রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনার বন্দরে এনে জাহাজে তোলা হয়। শনিবার থেকে শুরু হওয়া কর্মবিরতিতে সীমিত আকারে বের হলেও গত মঙ্গলবার, বুধবার ও বৃহস্পতিবার ডিপোগুলো থেকে কনটেইনার বের হয়নি।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো সমিতির মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কর্মবিরতির কারণে ডিপো থেকে বন্দরে কনটেইনার আনা-নেওয়া যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রফতানি কনটেইনার জাহাজি করণের জন্য ছিল প্রায় ১১ হাজার। আমদানি করা কনটেইনার আছে আট হাজার এবং খালি কনটেইনার আছে ৫২ হাজার। কর্মবিরতির কারণে ডিপোগুলোতে কনটেইনার স্তূপ হয়েছে। ডেলিভারি হলে ডিপোগুলো যে চার্জ পেতো ডেলিভারি না হওয়ায় এখন চার্জ পাচ্ছে না। কনটেইনারগুলোর মূলত ক্ষতি এটাই। তবে এই আন্দোলন দীর্ঘদিন থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।’
ছয় দিনে কোটি টাকা ক্ষতির মুখে ১২ বার্থ অপারেটর
বন্দরের বার্থ অপারেটরস, শিপ-হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বন্দরে ১২টি বার্থ অপারেটর আছে। শনিবার থেকে শুরু হওয়া কর্মবিরতির কারণে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে বার্থ অপারেটররা। এই অচলাবস্থা দ্রুত কেটে না গেলে সামনে রমজানে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দেওয়া কষ্টকর হবে। পুরোদমে বন্দর বন্ধ থাকলে দৈনিক ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা করে ক্ষতির মুখে পড়ছে বার্থগুলো। গত ছয় দিনে অন্তত কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে বার্থগুলো।’
বদলি নিয়ে উত্তেজনা
এনসিটি চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে শনিবার প্রথমদিন কর্মবিরতির পর বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারী চার জনকে তাৎক্ষণিক বদলি করে। পরদিন রবিবার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও ১২ জনকে ঢাকার পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালে বদলি করা হয়। সোমবার আন্দোলনরত আরও ১৫ কর্মচারীকে নতুন করে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে এ বদলির কথা জানানো হয়। এ নিয়ে আন্দোলনে জড়িত মোট ৩১ জনকে বদলি করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে তারা বদলিকৃত স্থানে যোগদান করেননি।
প্রভাব পড়বে রাজস্বে
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার (জনসংযোগ) শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কর্মবিরতির প্রভাব এখনও কাস্টমসের রাজস্ব আদায়ে পড়েনি। তবে আর কিছুদিন এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব রাজস্ব আদায়ে পড়বে।’
ক্ষতি নির্ণয়ে তদন্ত কমিটি
বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কর্মবিরতির কারণে বন্দরের কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তা নির্ণয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি এখনও রিপোর্ট দেয়নি। রিপোর্ট পাওয়ার পর জানা যাবে।’
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
বন্দরের কোন টার্মিনাল কারা পরিচালনা করছে
২০০৭ সাল থেকে আংশিক এবং ২০১৫ সাল থেকে পূর্ণমাত্রায় এনসিটি পরিচালনা করে আসছিল দেশীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ার টেক। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের ৬ জুলাই। এরপর এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেডকে। নৌবাহিনীর হাতে আসার পর বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং, আমদানি-রফতানি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বন্দরের বাকি টার্মিনালগুলোর মধ্যে চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনা করছে সাইফ পাওয়ার টেক। এ ছাড়া জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) পরিচালনা করছে বন্দর নিজেই এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনা করছে সৌদি আরব ভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটিই)। ২০২৪ সালের জুন থেকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি পিসিটি পরিচালনা করছে। চুক্তি অনুযায়ী নিজস্ব সরঞ্জাম দিয়ে ২২ বছর পিসিটি পরিচালনা করবে সৌদি আরবের কোম্পানি।
সূত্র ও ছবি : বাংলা ট্রিবিউন
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


