সাইফুল ইসলাম : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-৩ আসনে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আফরোজা খানম রিতা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়ে এক লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় জোট মনোনীত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের প্রার্থী মো. সাঈদ নূর পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২৪২ ভোট। অন্যদিকে, মাত্র ২০ হাজার ৫৫১ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান আতা।

বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা ভোট গণনা শেষে বেসরকারিভাবে এ ফলাফল ঘোষণা করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে- দক্ষতা ও যোগ্যতা, দূরদর্শিতা, সততা ও স্বচ্ছতা, জনসমর্থন তৈরির সক্ষমতা, সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা, দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা ও ইতিবাচক ভাবমূর্তিসহ নানা নৈপুণ্যসম্পন্ন বৈশিষ্ট্যের জন্যই আফরোজা খানম রিতা নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। অপরদিকে, গোপন পরিকল্পনা, বিভাজন সৃষ্টি, গুজব বা অপপ্রচার ব্যবহার, মিত্রতা বদলানো, চাপ প্রয়োগের কৌশল ও স্বল্প মেয়াদী লাভের আগ্রসহ নানা কূটকৌশলের কারণে ভরাডুবি হয়েছে আতাউর রহমান আতার।
আফরোজা খানম রিতার এ নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে নির্বাচনের আগে তাঁকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি সমালোচনামুখর ও দল থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান আতার রাজনৈতিক কৌশল কার্যত ভেস্তে গেছে বলে মনে করছেন তাঁর সমর্থকরা। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন আতা, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ফলে তাঁর পরাজয়কে অনেকে ‘কূটকৌশলের ভরাডুবি’ হিসেবেই দেখছেন।
দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে নিজেকে জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতা দাবি করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন আতাউর রহমান আতা। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আফরোজা খানম রিতার মনোনয়ন বাতিলের লক্ষ্যে নানা অভিযোগ উত্থাপন করেন তিনি। প্রথমে রিতাকে ঋণখেলাপি ও তিতাস গ্যাসের বিল বকেয়া রয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে প্রচার চালান। পরে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের দিন রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় তিনি নিজের ওপর হামলা ও হেনস্তার অভিযোগও আনেন।
পরবর্তীতে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার আচরণকে পক্ষপাতমূলক আখ্যা দিয়ে এবং রিতার সমর্থকদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেন আতাউর রহমান আতা। তবে তাঁর এসব দাবির পক্ষে তিনি কোনো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। একই সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট একান্তে কথা বলেছেন এবং বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। জেলার একাধিক সিনিয়র নেতা এ দাবিকে অসত্য বলে অভিহিত করেন।
তৎকালীন বক্তব্যে আতা আরও বলেন, দলের হাইকমান্ড তাঁকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধ করেনি। বরং জনগণের অনুরোধেই তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন এবং ধানের শীষের সমর্থন রক্ষায় মাঠে নেমেছেন।
তবে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাকে জেলা পর্যায়ের বিএনপির সিনিয়র নেতারা ‘হঠকারিতা’ ও ‘রাজনৈতিক কৌশলগত ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন।
এছাড়া, নির্বাচনী প্রচারণাকালে আফরোজা খানম রিতাকে ‘বহিরাগত’ ও ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে প্রতিহত করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে আতাউর রহমান আতার এক স্বজনের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে আতার পক্ষ থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীকে নিয়ে অসৌজন্যমূলক মন্তব্যও করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক লিটন দাবি করেন, আতাউর রহমান আতার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে দল বিব্রত। তিনি তাঁকে মানসিক ভারসাম্যহীন উল্লেখ করে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন। পাশাপাশি নারী ও আর্থিক সংশ্লিষ্ট বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।
সার্বিকভাবে, মানিকগঞ্জ-৩ আসনের এ নির্বাচন রাজনৈতিক উত্তাপ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও কৌশলগত লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলেও ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে ভোটারদের চূড়ান্ত রায়।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


