বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর চিরবিদায় নিলেন। কবি, কথাসাহিত্যিক ও ‘নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম’ খ্যাত সাহিত্যিক ভাস্কর চৌধুরী আর নেই। রোববার রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, গত ১৫ জুন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের পরীক্ষায় তার খাদ্যনালীতে টিউমার ধরা পড়ে। পাশাপাশি ফুসফুসে পানি জমা এবং দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসজনিত নানা জটিলতায় তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায়। শেষ পর্যন্ত সব চিকিৎসা প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি চলে গেলেন অনন্তের পথে।
পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তার মরদেহ জন্মস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জে নেওয়া হবে এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হবে।
১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের রাজারামপুরের ভবানীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ভাস্কর চৌধুরী। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যচর্চার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমে সাহিত্যজগতে পথচলা শুরু হলেও পরবর্তীতে জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ।
সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালন করলেও সাহিত্যসাধনা থেকে কখনও বিচ্যুত হননি। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে প্রায় ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। তার লেখায় উঠে এসেছে মানুষের জীবনসংগ্রাম, গ্রামীণ বাস্তবতা, লোকজ সংস্কৃতি এবং সমাজের নানা অনুচ্চারিত গল্প।
বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রকৃতি, জনজীবন, সংস্কৃতি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনচিত্র তার সাহিত্যকর্মে অনন্যভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সংগ্রামী জীবন নিয়ে রচিত তার মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘ধনসা মাতি ও তার জীবনবৃক্ষ’ বাংলা সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে ‘রক্তপাতের ব্যাকরণ’ গল্পগ্রন্থ তাকে পাঠকসমাজে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।
কবিতা অঙ্গনেও ছিল তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। দীর্ঘ কবিতা ‘নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম’ দুই বাংলার আবৃত্তিপ্রেমী ও সাহিত্যঅনুরাগীদের কাছে সমান জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই কবিতাই তাকে বিশেষভাবে পরিচিত করে তোলে।
তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— *রক্তপাতের ব্যাকরণ, বাষট্টি বিঘা নদী, কোথায় নিবাস, পতনের সময়, শনিবারে বৃষ্টি, লালমাটি কালো মানুষ, স্বপ্নপুরুষ, মীমাংসা পর্ব, আষাঢ়ের জীবনদর্শন, ভূমি, কৃষ্ণপুরাণ, কখনও কখনও এরকম ঘটে, আমার কেবলই সমর্পণ, নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম, আমার ভেতরে আঁধার, পরাণের গহীন* এবং *তোর বড় কষ্টরে*।
ভাস্কর চৌধুরীর মৃত্যুতে সাহিত্যাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সমকালীন সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও পাঠকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই মনে করছেন, তার প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য হারাল এক নিবেদিতপ্রাণ স্রষ্টাকে, যার লেখনী বরেন্দ্র জনপদ ও প্রান্তিক মানুষের জীবনকে নতুন মাত্রায় তুলে ধরেছিল।
তার সৃষ্টি, চিন্তা ও সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন পাঠকের হৃদয়ে। বাংলা সাহিত্যে তার অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



