আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মানুষের নানা কর্মে নানানভাবে সাহায্য করে থাকে পশুপাখি। কবুতর দিয়ে চিঠি আদান-প্রদানের কথা কে না জানে? কিংবা ঘোড়া দিয়ে যুদ্ধ যাত্রার কথা। কবুতর শুধু চিঠি আদান-প্রদানই নয় কবুতরে চালাতো মিসাইল। বর্তমানে যে কুকুর পুলিশের নানা কাজে ব্যবহার করা হয় সেই কুকুর ধ্বংস করতো শত্রুর ট্যাংক। অবাক হলেও সত্য যে, বিশ্বযুদ্ধে মানুষের পাশাপাশি বীরত্ব দেখিয়েছিলো পশু ও প্রাণীরা। শত্রুর বিরুদ্ধে সে সময় মিসাইল চালিয়েছিলো কবুতর।

কবুতর

Advertisement

কবুতরকে আমরা জেনে থাকি শান্তির প্রতীক হিসেবে। সেই কবুতরই ২য় বিশ্বযুদ্ধে করেছে মিসাইল পরিচালনা। জার্মান শত্রুদের ধ্বংস করার জন্য কবুতর দিয়ে মিসাইল পরিচালনা করতেন আমেরিকার সেনাবাহিনী। এমনই এক অভিনব উপায় আবিষ্কার করেছিলেন মার্কিন মনোবিজ্ঞানী বি এফ স্কিনার। এই প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছিলো প্রজেক্ট পিজিয়ন।

২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় শত্রুকে ধ্বংসের জন্য ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের সঠিক বিস্ফোরণ করতেই ব্যবহার করা হতো কবুতরকে।

কিভাবে শত্রুকে হত্যার কাজে লাগানো যায় এ নিয়ে ভাবছিলান স্কিনার। ১৯৪১ সালের জুন মাসে তিনি এ বিষয়ে সাহায্য চায় আমেরিকার ন্যাশনাল ডিফেন্স রিসার্চ কমিটির গবেষকদের। প্রথমে এ বিষয়টিকে তারা হেসেই উড়িয়ে দেন। তবুও হাল ছাডেননি স্কিনার। পার্ল হারবারে হামলার পরে আবার স্কিনার হাজির হয় গবেষকদের কাছে। তার বিস্তারিত পরিকল্পনা ও ভিডিও ফুটেজ নিয়ে দেখায় তাদের। এবার আগ্রহ দেখায় প্রতিষ্ঠানটি। এ কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় জেনারেল মিলস ইনকর্পোরেশনের মেকানিক্যাল প্রধান এডি হাইড। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ৫০০০ ডলার বরাদ্দ দেয় তার কোম্পানি। এরপর ১৯৪৩ সালের জুনে আমেরিকার সরকার স্কিনারকে বরাদ্দ দেয় ২৫০০০ ডলার। স্কিনার ৬৪ টি কবুতর নিয়ে শুরু করেন তার কাজ।

স্কিনার তার কবুতরগুলোকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়। লিভারে চাপ দিয়ে কিভাবে খাবার বের করা যায় এই ট্রেনিং দেয় কবুতরগুলোকে। কবুতর বিচক্ষণ ও শান্ত পশু হওয়ায় স্কিনার কবুতরকে বেছে নেয় এই কাজের জন্য। প্রশিক্ষণের সময় কবুতরগুলোকে দিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষবস্তুতে ঠোঁট দিয়ে ঠোকর দেওয়া শেখায় স্কিনার। কবুতর ঠিকঠাক কাজ করলে স্কিনার তাদের বিভিন্ন খাবার পুরস্কার দিতেন। এরপর চেনায় লক্ষবস্তুর আকার। এটাও শেখায় যে সেই চেনা লক্ষবস্তু পেলেই যেন কবুতররা ঠোঁট দিয়ে আঘাত করে।

কৃত্রিম মিসাইল তৈরি করে স্কিনার মিসাইলের অবস্থা, তাপ, শব্দ, আলো ইত্যাদি বিষয় শেখায় কবুতরগুলোকে। কোনাকৃতির বক্স বানিয়ে স্কিনার তাদের প্রশিক্ষণ দেয় লক্ষবস্তু চেনা এবং আঘাতের । এরপর কবুতরের ঠোঁটে লাগানো হতো একটি ধাতব ঠোঁট। মিসাইলের সামনে সংযুক্ত লেন্সের সাহায্যে ককপিটের সামনের পর্দায় কবুতরকে দেখানো হতো মিসাইলের সামনের অংশ। সেই চেনা লক্ষবস্তু পেলেই কবুতর ঠোঁট দিয়ে আঘাত করতো। এভাবেই মিসাইল উড়ে যেতো শত্রুর দিকে। কোন কারণে যদি মিসাইল লক্ষচ্যূত হতো তাহলে পর্দার যে অবস্থান চেঞ্জ হতো কবুতরগুলো সেখানে আঘাত করতো। লক্ষবস্তু কাছে এলেই পর্দায় তা বড় হতো। কবুতরগুলো এভাবে নিখুতভাবে মিসাইল চালনা করতে পারত।

এই অভিযানে ৮০% সফল হয়েছিলো স্কিনার। রাতের বেলা এই পদ্ধতিতে মিসাইল চালনা করা যেতো না এক্ষেত্রে ব্যর্থ হতো অভিযান। নানা কারণে আমেরিকার সামরিক কর্তারা এটিকে বন্ধ করে দেয়। ৮ অক্টোবর ১৯৪৪ সালে বন্ধ হয়ে যায় প্রজেক্ট পিজিয়ন। তবুও এই কবুতরগুলো সংরক্ষণ করেছিলেন স্কিনার এটি দেখতে যে তারা এই প্রশিক্ষণ কতদিন মনে রাখে। ছয় বছর পরেও এসব কবুতর ঠিকঠাক কাজ করেছিলো। প্রথম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ২ লাখ কবুতর ব্যবহৃত হয়েছিলো বার্তা আদান প্রদানের কাজে।

শুধুমাত্র কবুতর নয় দুই বিশ্বযুদ্ধেই কুকুরদের ভূমিকা ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কুকুরকে দিয়ে ফাস্ট এইড এবং খাবার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো হতো। ২য় বিশ্বযুদ্ধে কুকুর হয়ে উঠে শত্রু হত্যার অন্যতম হাতিয়ায়। সে সময় সাধারণ মানুষ তাদের কুকুরগুলো দিয়েছিলো সেনাবাহিনীর হাতে। ‘এন্টি ট্যাংক ডগ’ এই নামের কুকুরদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে ব্যবহার করা হতো শত্রুর ট্যাংক ধ্বংসের কাজে। সেই সাথে ধ্বংস হতো কুকুর নিজেও।

সেনাবাহিনীর কিংবা যুদ্ধের ট্যাংক এমন ভাবে বানানো হয় যে এর উপর আপনি যতই বিস্ফোরণ করেন সেটি ধ্বংস হবে না। ট্যাংক ধ্বংস করতে হলে অবশ্যই নিচে থেকে বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে।

বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন এনিমেল সার্কাস ট্রেইনার ও এনিমেল সাইন্টিসদের ভাড়া করে আনেন কুকুরদের বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য। ৬ মাস ট্রেনিং দেওয়া হয় যেন এসব কুকুর বোম বিস্ফোরণ করতে পারে জার্মান বাহিনীর ট্যাংকের নিচে। তবে কুকুরগুলো করেছিলো উল্টো কাজ। বিভ্রান্ত হয়ে বোম নিয়ে ফিরে আসতো সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকেই এবং সেসব বোম সেখানেই ধ্বংস করা হতো। এরপর নতুন আইডিয়া বের করেন তারা। কুকুরদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেয় যেন সেই বোম কোন সংস্পর্শে আসলেই সেটি ব্লাস্ট হয়। অর্থাৎ কুকুর ট্যাংকের নিচে গেলেই তা স্পর্শ পেয়ে বিস্ফোরণ হবে এবং মারা যাবে। একটি কুকুর ১২ কেজির বিস্ফোরণ বহন করতে সক্ষম ছিলো। ১৯৪১ সালে ৩১টি কুকুর পাঠানো হয় জার্মান সেনাদের ট্যাংকের নিচে কিন্তু সেসব কুকুর ফিরে আসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাবাহিনীর ট্যাংকের দিকে এবং তা সেখানেই ব্লাস্ট হয়। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনারা নিজেদের বাঁচাতেই হত্যা করে সেসব প্রশিক্ষণ কুকুর। কিন্তু কেন এমন করেছিল কুকুরগুলো।

জানা যায়, জার্মান বাহিনীর ট্যাংক ছিলো পেট্রোল ইঞ্জিন কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের যেসব ট্যাংক দিয়ে কুকুরদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সেটি ছিলো ডিজেল ইঞ্জিন। এরপর এই একই ভাবে ১৯৪৩ সালে কুকুর দিয়ে ট্যাংক ধ্বংস করেছিলো জাপানের সেনারা। সর্বশেষ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও এমন আইডিয়া কাজে লাগানোর কথা ভেবেছিলো রাশিয়ার সেনাবাহিনী।

শুধুমাত্র কবুতর কিংবা কুকুর নয়। বর্তমানে শত্রুর ড্রোন ধ্বংসের জন্য ইগলের ব্যবহার করছেন ডাচ পুলিশরা। ড্রোন দিয়ে শত্রুর স্থান নির্দারণ বা বোম ব্যবহার ক্ষতি করে থাকে। এই ক্ষতি থেকে বাঁচতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ইগলগুলোকে। ইগল শত্রুর ড্রোনকে মাটিয়ে নামিয়ে আনলেই পুরস্কার হিসেবে পায় মাংস।

সবচেয়ে সাহসী ওয়েব সিরিজ এটি, ভুলেও কারও সামনে দেখবেন না

ঠিক একইভাবে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ডলফিন দিয়ে পাহাড়া দেয় পারমাণবিক অস্ত্র। দেশটির ওয়াশিংটনের নৌবাহিনীর ঘাঁটি ‘Naval vase kitsap’- এ রয়েছে প্রায় দশ হাজার পারমাণবিক বোমা। সেনা-নৌবাহিনীর পাশাপাশি এই বোমা পাহাড়া দেওয়ার কাজ করছে ডলফিন। ২০১০ সাল থেকেই তারা দায়িত্ব নিয়ে কাজটি করছে। এদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে ১৯৬৭ সালে। স্পেস অ্যান্ড নেভাল ওয়ারফেয়ার সিস্টেম ইস্পাওয়ারের অধীনে ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট দিয়াগোতে চলে প্রশিক্ষণ। বর্তমানে ৮৫টি ডলফিনের পাশাপাশি ৫০টি সি লায়নেরও প্রশিক্ষণ সেখানে চলছে। সাধরণত এদের কাজ হলো মাইন পরিষ্কার করা, মিত্র বাহিনীর নিরাপত্তা দেওয়া ও উদ্ধার অভিযান চালানো। সমুদ্রে মাইন শনাক্ত করাসহ নৌবাহিনীর নানান কাজে সাহায্য করে প্রশিক্ষিত ডলফিনগুলো। সৈনিক ডলফিন যে কোনো বিপজ্জনক বস্তু চিহ্নিত করতে পারে। এদের রয়েছে পানির নিচে ভালোভাবে দেখার জন্য ইকোলোকেশন ব্যবহারের ক্ষমতা। প্রতিধ্বনির মাধ্যমে সাগরের গভীরে যে কোনো বস্তুর অবস্থান নির্ধারণের পদ্ধতি হলো সোনার টেকনোলজি। পানির তলদেশই নয়, উপরের বিপজ্জনক বস্তুও তারা চিহ্নিত করতে পারে।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.