জাহিদ ইকবাল : রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো পদ বা ক্ষমতার নাম নয়—এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। নেতৃত্ব মানে কেবল মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দেওয়া নয়, নেতৃত্ব মানে জাতিকে দিশা দেখানো, সংকটে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ রাষ্ট্র রেখে যাওয়া। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের স্বীকার করতেই হবে—ভালো, শিক্ষিত ও নৈতিক মানুষ রাজনীতির জগৎ থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। এই অনুপস্থিতিই আজ বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট।

যে রাজনীতি একদিন আদর্শ ও আত্মত্যাগের ভাষায় কথা বলত, আজ অনেক ক্ষেত্রে তা পরিণত হয়েছে ভয়, প্রভাব আর সুবিধাবাদের খেলায়। রাজনীতির এই রূপান্তর শুধু দল বা নেতাকর্মীদের ব্যর্থতা নয়—এটি রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন।
গবেষণা কী বলে
গবেষণা ও সামাজিক পর্যবেক্ষণ বলছে, শিক্ষিত ও ভালো মানুষের রাজনীতিতে না আসার পেছনে কয়েকটি সুস্পষ্ট কারণ কাজ করছে।
প্রথমত, রাজনীতির সহিংস ও কলুষিত পরিবেশ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অনেক দেশে রাজনীতিকে সাধারণ মানুষ “ঝুঁকিপূর্ণ পেশা” হিসেবে দেখে। রাজনৈতিক সহিংসতা, মামলা-হামলা, হুমকি—এসব শিক্ষিত মানুষের কাছে স্বাভাবিক জীবনের বড় বাধা।
দ্বিতীয়ত, নৈতিক মূল্যবোধের অবমূল্যায়ন। রাজনীতিতে টিকে থাকতে অনেক সময় আপস, সুবিধাবাদ কিংবা অনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়—এই ধারণা শিক্ষিত ও সৎ মানুষকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখে। তারা মনে করে, সততা নিয়ে রাজনীতিতে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।
তৃতীয়ত, মনোনয়ন বাণিজ্য ও অর্থশক্তির প্রাধান্য। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে—রাজনীতিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অর্থ একটি বড় বাধা। প্রচারণা, সংগঠন পরিচালনা, মামলা মোকদ্দমা—সবকিছুর পেছনেই বড় অঙ্কের অর্থ লাগে। ফলে মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত মানুষ শুরুতেই নিজেকে অযোগ্য মনে করে।
চতুর্থত, সমাজে রাজনীতিবিদদের নেতিবাচক ইমেজ। রাজনীতিকে অনেকেই দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে এক করে দেখেন। ফলে পরিবার ও সমাজ থেকেও শিক্ষিত তরুণদের রাজনীতিতে আসতে নিরুৎসাহিত করা হয়।
এই কারণগুলো মিলেই এক ভয়ংকর শূন্যতা তৈরি করেছে—যেখানে রাজনীতি থেকে ভালো মানুষ সরে যাচ্ছে, আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে অযোগ্যতা ও পেশিশক্তি।
ভালো মানুষ রাজনীতিতে না এলে কী হয়?
* নীতি নির্ধারণ দুর্বল হয়।
* রাষ্ট্র পরিচালনায় দূরদর্শিতা হারিয়ে যায়।
* আইন হয়, কিন্তু ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় না।
* রাজনীতি তখন আর জনগণের কণ্ঠস্বর থাকে না—তা হয়ে ওঠে কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার যন্ত্র। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ক্রমেই অধরা হয়ে পড়ে।
এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কেবল অভিযোগ নয়, প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার।
প্রথমত, রাজনীতিতে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনীতি যেন জীবনের ঝুঁকি না হয়।
দ্বিতীয়ত, মনোনয়ন ব্যবস্থার সংস্কার। অর্থ ও পেশিশক্তির বদলে শিক্ষা, সততা ও জনসেবার রেকর্ডকে প্রাধান্য দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে স্বচ্ছ প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।
তৃতীয়ত, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা আইনে নির্ধারণ। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত নির্বাচিত পদের জন্য শিক্ষাগত মানদণ্ড নির্ধারণ করা হলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষিত মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে।
চতুর্থত, রাজনীতিকে পেশা নয়, সেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। সুযোগ-সুবিধার সীমা নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হলে রাজনীতি আর অবৈধ আয়ের ক্ষেত্র থাকবে না।
নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের একটি মৌলিক সত্য মেনে নিতে হবে—শিক্ষিত, ভালো ও নৈতিক মানুষ ছাড়া রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। রাজনীতি যদি ভালো মানুষের জন্য বন্ধ দরজা হয়ে থাকে, তবে রাষ্ট্রও একদিন তাদের জন্য নিরাপদ থাকবে না।
আমি বিশ্বাস করি—যেদিন রাজনীতির দরজা শিক্ষিত মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থে খুলে যাবে, সেদিন রাজনীতি আর ভয় বা ঘৃণার নাম থাকবে না। রাজনীতি তখন হবে মানুষের আস্থা, রাষ্ট্র হবে মানুষের আশ্রয়।
আরও পড়ুন : কিছু ভুয়া খবর দেখলাম : তাহসান
এই লেখাটি কোনো দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়—এটি একটি সময়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত সতর্কবার্তা। কারণ ভালো মানুষ যদি রাজনীতিতে না আসে, তবে রাজনীতি খারাপ মানুষের হাতেই বন্দি থাকবে।
লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


