মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি : মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় অষ্টম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীর তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক কিশোরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার পর মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ঢাকা-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমানউল্লাহ আমানকে জড়িয়ে ভিত্তিহীন প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা এবং স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা।

ঘটনাটি গত ১৮ জুন উপজেলার চান্দহর ইউনিয়নের সোনাটেংরা গ্রামে ঘটে।
জানা গেছে, শান্তিপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. ফারিমের সঙ্গে ১৭ জুন বিদ্যালয়ে সহপাঠী ইয়াছিন মোল্লার তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে ফারিম ও তার কয়েকজন বন্ধু ইয়াছিনকে মারধর করে। পরে ওই দিন বিকেলে ফারিমের মা শিউলি খানম ইয়াছিনের বাড়িতে গিয়ে তার বাবা হালিম মোল্লার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে হালিম মোল্লা তা প্রত্যাখ্যান করে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরদিন ১৮ জুন টিফিন বিরতির সময় বাড়ি ফেরার পথে ফারিম ও তার খালাতো ভাই সিজানের গতিরোধ করে ইয়াছিন মোল্লাসহ কয়েকজন। পরে ধারালো দা দিয়ে ফারিমের মাথায় কোপ দেওয়া হয় এবং লাঠিসোঁটা দিয়ে মারধর করা হয়। এতে সে গুরুতর আহত হয়। হামলার সময় তার হাতে থাকা একটি স্বর্ণের আংটিও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ২৫ জুন ফারিমের মা শিউলি খানম সিংগাইর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় ইয়াছিন মোল্লা, তার বাবা হালিম মোল্লা, ভাই শীতল মোল্লা, চাচা লুৎফর মোল্লা ও মজিবর মোল্লা, চাচী শিল্পী আক্তার, মা রোজিনা আক্তার এবং রাশেদা নামে এক নারীকে আসামি করা হয়।
মামলার পর আসামিপক্ষ অভিযোগ তোলে, বাদী শিউলি খানমের মা মোসাম্মৎ নাসিমা ঢাকা-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আমানউল্লাহ আমানের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং তার প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় মানুষকে হয়রানি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের এ ধরনের দাবি ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোসাম্মৎ নাসিমা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে প্রায় ২২ বছর ধরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত। তার স্বজন ও স্থানীয়রাও জানান, তিনি আমানউল্লাহ আমানের বাসার গৃহকর্মী নন এবং তার প্রভাব খাটানোর অভিযোগও সঠিক নয়।
হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে ইয়াছিনের বাবা হালিম মোল্লা বলেন, ঘটনার সময় তিনি ও তার বড় ছেলে শীতল মোল্লা বিদেশগমনসংক্রান্ত প্রশিক্ষণে ছিলেন এবং তার স্ত্রী ব্যাংকে গিয়েছিলেন। আগের দিন ইয়াছিনকে মারধরের পর শিউলি খানম ও তার মা তাদের বাড়িতে গিয়ে অশালীন আচরণ করেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, আমার ছেলে তার সহপাঠী ফারিমকে মারধর করার পর এলাকার অনেক মুরুব্বীদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছি। কিন্ত মুরুব্বীরা বলেছেন, এ ঘটনায় আমানউল্লার’র স্ত্রী ফোন দিয়ে বিষয়টি কঠোরভাবে দেখতে বলেছে এবং মামলা করতে বলেছে। আমানউল্লার’র স্ত্রী কাকে ফোন দিয়ে এমন কথা বলেছেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক কোষাধ্যক্ষ আব্দুল মালেকের কাছে তিনি এমনটা শুনেছেন। উপজেলা বিএনপির সবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আমজাদ হোসেনও এমনটিই বলেছেন বলে তিনি জানান। এ সময় আব্দুল মালেকও বিএনপি নেতা আমজাদ হোসেনের কাছে এটি শুনেছেন বলে জানান। আব্দুল মালেক বলেন, দুই পক্ষের বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা হয়েছিল। তবে নাসিমা সরকারি চাকরি করেন। তিনি আমানউল্লাহ আমানের প্রভাব খাটান—এমন কোনো ঘটনা তাদের জানা নেই।
লুৎফর মোল্লার দাবি, নাসিমা আগে আমানউল্লাহ আমানের বাসায় কাজ করতেন এবং এখনও তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, নাসিমা প্রায়ই সেই সম্পর্কের কথা বলে তাদের ভয়ভীতি দেখান।
ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তানভীর সর্দার, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা তৈয়ব আলী, স্থানীয় সোহরাব মাদবর, রোকসানা আক্তার, আসিফ ইকবালসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, নাসিমা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিতে কর্মরত। তিনি আমানউল্লাহ আমানের বাসার গৃহকর্মী নন এবং তার প্রভাব খাটানোর অভিযোগেরও কোনো ভিত্তি নেই। পরিকল্পিতভাবে বিএনপির দুর্নাম করতে এমপি আমানউল্লাহর নাম জড়ানো হয়েছে। এসময় তারা বিএনপির একজন এমপিকে নিয়ে মিথ্যাচারের বিচার দাবি করেন।
মোসাম্মৎ নাসিমা নিজের সরকারি পরিচয়পত্র দেখিয়ে বলেন, “আমি ২২ বছর ধরে সরকারি চাকরি করছি। আমানউল্লাহ আমানের বাসায় কাজ করি না। আমার কোনো ছেলে সন্তানও নেই। বৃদ্ধ স্বামী ও মেয়েদের নিয়ে বসবাস করি। প্রতিপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করছে এবং এখন আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।”
তবে মজিবর মোল্লা, হালিম মোল্লা, লুৎফর মোল্লা ও রফিজা বেগমসহ কয়েকজনের দাবি, বহু বছর আগে নাসিমা আমানউল্লাহ আমানের বাসায় কাজ করতেন। পরে সরকারি চাকরি হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রয়েছে এবং সেই সম্পর্কের কথা বলে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন।
হালিম মোল্লা আরও অভিযোগ করেন, বিরোধের জেরে তাদের ঘরে আগুন লাগানো হয়েছে এবং ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা টাকা চুরি হয়েছে। তবে সরেজমিনে ঘরের ভেতরে আগুনে পুড়ে যাওয়া কিছু আসবাবপত্র দেখা গেলেও বাইরে থেকে আগুন লাগানো হয়েছে কিনা সেটির সুস্পষ্ট কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। আগুনের উৎস বা কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আমজাদ হোসেন বলেন, আমানউল্লাহ আমান বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা, তিনি এ দেশের একজন রত্ন। তিনি বা তার স্ত্রী এ ঘটনায় কোন ধরনের হস্তক্ষেপ করেননি। তারা এ ঘটনার পর ফোনও দেননি। এ ঘটনায় তাদের নাম জড়ানো ঠিক হয়নি। এটা অন্যায় হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ফজলুল হক এবং সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম জানান, সংসদ সদস্য আমানউল্লাহ আমান, তার স্ত্রী কিংবা পরিবারের অন্য কেউ এ ঘটনায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেননি। তারা বলেন, এক পক্ষের হামলায় একজন কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়মিত মামলা রুজু করে তদন্ত চলছে। অন্যদিকে ঘরে আগুন লাগানোর অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



