ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের জেরে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক জ্বালানি অনিশ্চয়তার মুখে একগুচ্ছ সাশ্রয়ী পদক্ষেপ বা কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি নেওয়ার কথা ভাবছে সরকার।

এর অংশ হিসেবে করোনাকালের মতো করে অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা ও কর্মকর্তাদের জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ ফেরানোর কথা বিবেচনা করছে সরকার। সেইসঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানোর ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আংশিকভাবে অনলাইন ক্লাস চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
এরই মধ্যে সব সরকারি সংস্থাকে জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়ে নিজস্ব প্রস্তাব তৈরি করতে বলা হয়েছে। আগামী মন্ত্রিসভা বৈঠকে এসব প্রস্তাবনা উপস্থাপন করার কথা রয়েছে। সূত্রমতে, বেশ কিছু মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে তাদের নিজস্ব কৃচ্ছ্রসাধনমূলক ব্যবস্থার খসড়া তৈরি শুরু করেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আপাতত তিন মাসের একটি স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে, পরিস্থিতি আরও জটিল হলে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলে যাবে সরকার। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের চড়া দাম, আমদানিতে বাড়তি খরচ ও ডলার সংকটের কারণে এই কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হাঁটছে সরকার।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনায় থাকা অন্তত আটটি পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে—সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়তি একদিন যোগ করা অথবা কর্মকর্তাদের সপ্তাহে দুদিন ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। এছাড়া, অফিসের কাজ দ্রুত শুরু করা অথবা কাজের মোট সময় কমিয়ে আনার প্রস্তাবও রয়েছে। বিদ্যুৎ খরচ কমাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সপ্তাহের অর্ধেক ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।
অবশ্য, এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মন্ত্রিসভায় ঠিক করা হবে কোন পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হবে।
এদিকে জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতেও বিশেষ নজর দিচ্ছে সরকার। অপ্রয়োজনীয় সরকারি ঋণ পরিহার করা ও কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাবও টেবিলে রয়েছে।
তবে, তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকার এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে না। জ্বালানি মজুত রোধে সরকার ইতোমধ্যে গত কয়েক দিনে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, চাপ কমাতে এখন চাহিদাপক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হতে পারে।
চাহিদাপক্ষ নিয়ন্ত্রণ বা ডিএসএম হলো ইউটিলিটি-চালিত এমন কিছু কৌশল, যার লক্ষ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরনকে প্রভাবিত করা, কমানো বা সরিয়ে নেওয়া। বিশেষ করে যখন বিদ্যুতের চাহিদা তুঙ্গে থাকে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তি দেন যে, আরও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, কোভিড আমলের অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। সিদ্ধান্তগুলো আরও আগেই নেওয়া যেত। প্রয়োজনে বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠক ডাকা যেতে পারে।
আরেকজন কর্মকর্তা আবার বলেন, বর্তমান মন্ত্রিসভার অনেকেই সরকার পরিচালনায় নতুন, যা সংকটের সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে। অতীতের সংকট মোকাবিলা করেছেন এমন ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় রোববার (২৯ মার্চ) অফিসগুলোকে চলতি মাসের শুরুর দিকে দেওয়া জ্বালানি সাশ্রয় সংক্রান্ত নির্দেশনাগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে।
এই নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে দিনের বেলা প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা, এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখা এবং ব্যবহার না করলে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ রাখা। অফিসগুলোকে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার ও বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। প্রতিটি অফিসে এই নিয়মগুলো তদারকি করতে সরকার একটি ‘ভিজিল্যান্স টিম’ বা নজরদারি দল গঠন করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ক্রমবর্ধমান চাপের আঁচ বাংলাদেশেও লাগতে শুরু করেছে। কারণ, জ্বালানি ও এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, যা তেল ও এলএনজি পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। সেখানে যেকোনো বিঘ্ন বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর দেশগুলোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। কারণ, এখানকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ব্যাপকভাবে বিদেশি গ্যাস ও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সরবরাহ সংকটের কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় আমদানি কমিয়ে স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে জ্বালানি কিনতে বাধ্য হয়েছে, যেখানে দাম অনেক চড়া। যুদ্ধের কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
কর্মকর্তারা জানান, এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ খাত ফার্নেস অয়েলের মতো ব্যয়বহুল বিকল্পের ওপর নির্ভর করছে। পাশাপাশি দেশের সীমিত শোধন ক্ষমতার কারণে বেশি দামে পরিশোধিত জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, পেট্রোবাংলা সতর্ক করেছে যে আগামী মাসগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কমতে পারে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে, সম্প্রতি কেনা এলএনজি যদি সময়মতো পৌঁছায়, তাহলে এপ্রিল মাসে কোনো প্রভাব পড়বে না।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


