ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সম্প্রসারণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর দখলে রয়েছে এবং সেটি ৭০ শতাংশে উন্নীত করার জন্য তিনি সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এই ঘোষণা এমন সময় এলো, যখন যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়ন ও শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে আলোচনা অচলাবস্থায় রয়েছে। খবর বিবিসি।

নেতানিয়াহু বলেন, তিনি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে (আইডিএফ) গাজার ৭০ শতাংশ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার এক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “বর্তমানে আমরা হামাসকে চাপে রেখেছি। গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর আগে যা ছিল ৫০ শতাংশ, তা এখন ৬০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আমার নির্দেশ হলো এটিকে আরও বাড়ানো।”
এ সময় উপস্থিত একজন “১০০ শতাংশ” বলে মন্তব্য করলে নেতানিয়াহু কিছুক্ষণ থেমে বলেন, “ধাপে ধাপে এগোতে হবে। প্রথমে ৭০ শতাংশ। সেখান থেকেই শুরু করা হবে। আমরা সব দিক থেকে তাদের ওপর চাপ বজায় রাখছি এবং বাকি অংশও ধীরে ধীরে মোকাবিলা করব।”
গাজায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তারের এই ঘোষণা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাস ওই যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল।
এ ছাড়া নেতানিয়াহুর এ মন্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গাজায় হামলা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চললেও তা এখনো অচলাবস্থায় রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত বছরের অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৩৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে।
নেতানিয়াহু এর আগেও একাধিকবার বলেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বর্তমানে গাজার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। অথচ ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির সময় এই হার ছিল প্রায় ৫৩ শতাংশ। চুক্তি অনুযায়ী, আইডিএফ “ইয়েলো লাইন” নামে পরিচিত একটি সীমারেখা পর্যন্ত সরে যায়, যার ফলে গাজার প্রায় অর্ধেকের বেশি অংশ ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে থাকে।
২০ দফার শান্তি প্রস্তাবের পরবর্তী ধাপে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা এখনো স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
গত বুধবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার নেতৃত্বে যারা ছিল, তাদের সবাইকে নির্মূল করার অঙ্গীকার করেছে তার দেশ। তিনি আরও বলেন, “হামাস গাজায় বেসামরিক বা সামরিক—কোনোভাবেই শাসন করতে পারবে না।” পাশাপাশি তিনি গাজা থেকে “স্বেচ্ছায় অভিবাসন” পরিকল্পনা যথাসময়ে বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করেন।
এদিকে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ এর আগেও গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের তথাকথিত “স্বেচ্ছা স্থানান্তর” এবং সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, এটি বেসামরিক জনগণকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের শামিল হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চলতি সপ্তাহেও গাজায় একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বুধবার গভীর রাতে গাজা সিটির একটি ভবনে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে পাঁচজন শিশু ছিল।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন আরও প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার মানুষ। যুদ্ধের ফলে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



