চ্যাটজিপিটি বা আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক টুল জনপ্রিয় হওয়ার আগে ইন্টারনেটে মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র ছিল গুগল সার্চ। কোনো তথ্য জানার প্রয়োজন হলেই ব্যবহারকারীরা সরাসরি গুগলে অনুসন্ধান করতেন। গুগলের হোমপেজ খুললেই চোখে পড়ত একেবারে সাদা, সরল একটি পৃষ্ঠা—মাঝখানে শুধু রঙিন লোগো এবং একটি সার্চ বক্স।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ওয়েবসাইটগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও গুগলের হোমপেজে কোনো ব্যানার বিজ্ঞাপন, পপ-আপ বা অপ্রয়োজনীয় কনটেন্ট দেখা যায় না। প্রশ্ন হলো, এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান কেন তাদের হোমপেজে বিজ্ঞাপন দেখায় না? এর পেছনে রয়েছে গভীর একটি ব্যবসায়িক কৌশল।
১৯৯৮ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র ল্যারি পেজ এবং সের্গেই ব্রিন গুগল প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত, সহজ এবং কার্যকর একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করা। শুরুতে গুগলের হোমপেজের সরলতার পেছনে কোনো জটিল পরিকল্পনা ছিল না; সীমিত ডিজাইন ও সহজ কোডিং কাঠামো ব্যবহার করেই তারা একটি সার্চ বক্স তৈরি করেছিলেন। পরে দেখা যায়, এই সরল ও মিনিমাল ডিজাইনই ব্যবহারকারীদের কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়।
তৎকালীন সময়ে ইয়াহু! বা এমএসএন-এর মতো জনপ্রিয় পোর্টালগুলো খবর, বিজ্ঞাপন ও নানা ধরনের সার্ভিসে ভরপুর থাকত, ফলে সেগুলো লোড হতে বেশি সময় লাগত। অন্যদিকে গুগলের পেজ ছিল হালকা ও দ্রুতগতির, যা ধীর ইন্টারনেট যুগে ব্যবহারকারীদের জন্য বড় সুবিধা হয়ে দাঁড়ায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা। ২০০০ সালের শুরুর দিকে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন, পপ-আপ ও ব্যানারে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। গুগল ঠিক বিপরীত পথে হাঁটে—তারা এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে, যেখানে ব্যবহারকারী দ্রুত তথ্য পায় এবং কোনো বিরক্তিকর বিজ্ঞাপন থাকে না। এই কৌশলই ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গুগলের মূল আয় আসে হোমপেজ থেকে নয়, বরং সার্চ রেজাল্ট-ভিত্তিক বিজ্ঞাপন থেকে। ব্যবহারকারীরা যখন কোনো নির্দিষ্ট বিষয় অনুসন্ধান করেন, তখন সেই তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। এই “টার্গেটেড অ্যাডভার্টাইজিং” মডেলের কারণে বিজ্ঞাপনদাতারা বেশি অর্থ দিতে আগ্রহী হন, ফলে গুগল বিশাল রাজস্ব অর্জন করে।
একটি সাধারণ হিসাব করলে দেখা যায়, গুগলের হোমপেজে যদি বিজ্ঞাপন থাকত এবং প্রতিদিনের বিপুল সংখ্যক ভিজিটকে কাজে লাগানো যেত, তাহলে সম্ভাব্য আয় হতে পারত অতি বিশাল অঙ্কের। তবে বাস্তবতা হলো, বিজ্ঞাপন থাকলে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা নষ্ট হতে পারত এবং মানুষ হয়তো গুগল ব্যবহারে আগ্রহ হারাত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুগল ইচ্ছা করলে হোমপেজ থেকেই বিপুল পরিমাণ আয় করতে পারত, কিন্তু তারা দীর্ঘমেয়াদী কৌশল হিসেবে পরিচ্ছন্ন, দ্রুত এবং বিজ্ঞাপনমুক্ত হোমপেজ বজায় রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
আজও গুগলের সেই সরল হোমপেজ শুধু একটি ডিজাইন নয়, বরং এটি আধুনিক ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে সফল ব্যবসায়িক কৌশলগুলোর একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


