আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত তুষারে ঢাকা নির্জন দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম উত্তপ্ত আলোচনার কেন্দ্রে। ২০২৬ সালে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন—যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মূল্যে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেবে। দ্বীপটির বাসিন্দা কিংবা ডেনমার্ক এই সিদ্ধান্ত পছন্দ করুক বা না করুক, ওয়াশিংটন সেখানে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছেন তিনি।

গ্রিনল্যান্ড

Advertisement

সম্প্রতি তেল শিল্পের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে আয়োজিত এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডের দখল না নেয়, তাহলে সেখানে রাশিয়া বা চীন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। তিনি স্পষ্ট করে জানান, রাশিয়া বা চীনকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রতিবেশী’ হিসেবে দেখতে চান না। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি ‘সহজ উপায়ে’ বিষয়টি মীমাংসা করতে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনে ‘কঠিন উপায়ে’—অর্থাৎ সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেও গ্রিনল্যান্ড দখলের হুঁশিয়ারি দেন।

গ্রিনল্যান্ডকে লিজ নেওয়ার পরিবর্তে পুরোপুরি মালিকানা কেন প্রয়োজন—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, কোনো জায়গাকে সঠিকভাবে রক্ষা করতে হলে তার মালিক হওয়া জরুরি। লিজ নেওয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রুশ সংবাদসংস্থা তাস শনিবার (১০ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে জানায়, ট্রাম্প বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড কেনার অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও ভবিষ্যতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর আগেও ২০২৫ সালের মে মাসে এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিটও জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়ে ট্রাম্প সক্রিয়ভাবে মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করছেন।

বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ১৯৫১ সালে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, ন্যাটোর আওতায় দ্বীপটির নিরাপত্তার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত। তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মন্তব্য করেছেন, গ্রিনল্যান্ড আগে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে এবং পরে শান্তিপূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে প্রেসিডেন্টের কাছে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিকল্প সবসময়ই খোলা রয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইনকে গুরুত্ব না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই তিনি গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা অর্জনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই আগ্রাসী অবস্থানের ফলে ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ সম্পর্কেও টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে। একদিকে ডেনমার্ক তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার কথা বলছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মালিকানার দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে।

খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের প্রতিযোগিতা দিন দিন তীব্র হচ্ছে। গ্রিনল্যান্ডের ভূগর্ভে রয়েছে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ—যেমন নিওডাইমিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়াম—যা স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি ও আধুনিক যুদ্ধবিমান তৈরিতে অপরিহার্য। বর্তমানে এই খনিজ বাজারে চীনের আধিপত্য ভাঙতেই গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে চান ট্রাম্প।

ভৌগোলিক দিক থেকেও গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার উত্তর উপকূলের কাছাকাছি হওয়ায় এখান থেকে মস্কোর সামরিক তৎপরতা ও ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকেই গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন থুলে এয়ার বেস চালু রয়েছে, যা এখন রাশিয়ার প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ঢাল হিসেবে বিবেচিত।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে যাওয়ায় গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। উত্তর মেরু দিয়ে নতুন নৌপথ চালু হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে দূরত্ব ও সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। একই সঙ্গে বরফের নিচে থাকা প্রায় সাড়ে ১৭ বিলিয়ন ব্যারেল তেল ও বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের পথও উন্মুক্ত হচ্ছে।

৫০ বছরে ইরান কাঁপানো যত আন্দোলন

এসব কারণেই গ্রিনল্যান্ড এখন আর শুধু বরফে ঢাকা এক নির্জন ভূখণ্ড নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের এক ‘নতুন স্বর্ণখনি’। যদিও প্রায় ৫৭ হাজার আদিবাসী বাসিন্দা তাদের মাতৃভূমিকে বিক্রির পণ্য হিসেবে দেখতে নারাজ, তবুও পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় এই শান্ত অঞ্চলটি এখন এক উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.