ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা চুক্তির সম্ভাবনা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান যে তিনটি মূল ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন, এই সাম্প্রতিক অগ্রগতি সেই ভিত্তিগুলোকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

প্রথমত, নেতানিয়াহু নিজেকে সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তবে সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা প্রক্রিয়ায় তাকে কার্যত পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এমনকি তার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তার অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন।
দ্বিতীয়ত, ইরানবিরোধী অবস্থান ছিল নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রবিন্দু। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু যুদ্ধের অবসান এমন সময় হচ্ছে, যখন অনেক বিশ্লেষকের মতে ইরান আগের তুলনায় আরও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
তৃতীয়ত, “মিস্টার সিকিউরিটি” হিসেবে পরিচিত নেতানিয়াহুর ভাবমূর্তিও এই পরিস্থিতিতে চাপের মুখে পড়েছে। নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনৈতিক অগ্রগতি এবং লেবানন ইস্যুতে নতুন চাপ তার নিরাপত্তা অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ইরান নীতিতে ধাক্কা
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশজুড়ে ছিল ইরানকে মোকাবিলা করা। কিন্তু সাম্প্রতিক অগ্রগতির পর দেখা যাচ্ছে, ইরানকে দুর্বল করার বদলে দেশটি আঞ্চলিক রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে গেছে বলে মনে করছেন সমালোচকরা।
ইসরায়েলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন অবস্থান গ্রহণের কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন। তার মতে, লেবানন ইস্যুতে ইরানের ভূমিকা স্বীকার করা হলে তা হিজবুল্লাহকে আরও প্রভাবশালী করে তুলতে পারে।
নতুন নিরাপত্তা সংকট
চুক্তির সম্ভাবনায় লেবাননেও সংঘাত সীমিত করার বিষয়টি থাকায় ইসরায়েলকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান সীমিত করতে হতে পারে। এতে নেতানিয়াহু নতুন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটে পড়েছেন।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেছেন, এমন কোনো চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। একইভাবে লিকুদ দলের একাধিক সদস্যও ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার বজায় রাখার কথা বলেছেন।
বিরোধীদের সমালোচনা
বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ বলেন, নেতানিয়াহু এখন কঠিন দ্বিধার মুখে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়া বা মার্কিন চাপ মেনে নেওয়া। তার মতে, উভয় পথই ইসরায়েলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
“মিস্টার সিকিউরিটি” ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস হামলার পর ইসরায়েল গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় সামরিক অভিযান জোরদার করে। তবে দীর্ঘ যুদ্ধেও হামাস পুরোপুরি নির্মূল হয়নি এবং গাজার বড় অংশ ধ্বংস হলেও সংগঠনটি এখনো সক্রিয় রয়েছে।
এছাড়া দীর্ঘ সামরিক মোতায়েনের কারণে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর চাপ বাড়ছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
ইরান কি আরও শক্তিশালী?
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ইসরায়েলের চাপের বিপরীতে ইরান বরং কৌশলগতভাবে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে তাদের অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ইসরায়েলের কৌশল পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
নীরব নেতানিয়াহু
চুক্তি ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় উঠলেও নেতানিয়াহু এখনো তুলনামূলকভাবে নীরব রয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি তার জন্য একটি জটিল কূটনৈতিক মুহূর্ত, যেখানে তাকে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



