মানুষ সামাজিক জীব—এ কারণে মতের ভিন্নতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু এই ভিন্নতা যখন শালীনতা, সংযম ও নৈতিকতার সীমা ছাড়িয়ে অহেতুক তর্কে পরিণত হয়, তখন তা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম এমন অনর্থক বিতর্ককে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে, কারণ এটি হৃদয়ের ঐক্য নষ্ট করে, ভ্রাতৃত্ব ভেঙে দেয় এবং অতীতের বহু জাতির ধ্বংসের অন্যতম কারণ হয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে বিতর্কের লক্ষ্য হওয়া উচিত সত্য উদ্ঘাটন ও সংশোধন—নিজেকে বড় প্রমাণ করা, জেদ দেখানো বা প্রতিপক্ষকে অপদস্থ করা নয়।
অহেতুক তর্ক নিন্দনীয় ও ধ্বংসের কারণ
অপ্রয়োজনীয় ও অসার তর্কে জড়িয়ে পড়া ইসলামে স্পষ্টভাবে নিন্দিত। এটি মানুষের অন্তরে হিংসা ও বিভেদ সৃষ্টি করে এবং সামাজিক বন্ধন দুর্বল করে দেয়।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, একবার কুরআনের একটি আয়াত পাঠের ভিন্নতা নিয়ে বিতর্কের আশঙ্কা দেখা দিলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—উভয় পাঠই সঠিক, তবে তর্কে লিপ্ত হতে নিষেধ করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পূর্ববর্তী জাতিগুলো তর্ক-বিতণ্ডার কারণেই ধ্বংস হয়েছিল (বুখারি)।
আরেক হাদিসে নবী (সা.) বলেন, “তোমরা পরস্পরের বিরোধে জড়াবে না, তাহলে তোমাদের হৃদয় বিভক্ত হয়ে যাবে।” (মুসলিম)
আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় মানুষ
অসার তর্কবিতর্ক আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয়। মুশরিকরা ঈসা (আ.)-কে নিয়ে যুক্তিহীন বিতর্ক সৃষ্টি করত—সত্য জানার জন্য নয়, বরং নিজেদের ভুল অবস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য। কুরআনে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা মূলত একটি বিতণ্ডাকারী সম্প্রদায় (সুরা জুখরুফ : ৫৮)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় মানুষ হলো সে, যে অতিমাত্রায় ঝগড়াটে ও বিতর্কপ্রবণ (বুখারি)।
তর্ক এড়িয়ে চললে জান্নাতের সুসংবাদ
ইসলাম শুধু নিষেধই করেনি, বরং অনর্থক বিতর্ক পরিহারকারীদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদও দিয়েছে। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি সত্যের পক্ষে থাকা সত্ত্বেও ঝগড়া ছেড়ে দেয়, তার জন্য জান্নাতের বিশেষ ঘরের দায়িত্ব তিনি নিজে নেন (আবু দাউদ)।
এটি প্রমাণ করে, ইসলামে ধৈর্য, সংযম ও নৈতিকতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে সদ্ভাবে আলোচনা করার অনুমতি
ইসলাম কখনো যুক্তিসংগত আলোচনা নিষিদ্ধ করেনি। বরং প্রয়োজন হলে প্রজ্ঞা, নম্রতা ও শালীনতার সঙ্গে যুক্তিভিত্তিক বিতর্কের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন—
“হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে মানুষকে তোমার রবের পথে আহ্বান করো এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো উত্তম পন্থায়।” (সুরা নাহল : ১২৫)
তবে এ বিতর্ক হবে বোঝার ও বোঝানোর জন্য, উত্তেজনা বা অপমানের জন্য নয়।
আল্লাহর প্রিয় বান্দারা তর্ক এড়িয়ে চলে
কুরআনে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে—তারা অজ্ঞ ও মূর্খদের সঙ্গে তর্কে জড়ায় না। বরং অশালীন কথার জবাবে শান্তভাবে বলে, “সালাম” (সুরা কাসাস : ৫৫, ফুরকান : ৬৩)। এখানে ‘সালাম’ বলার অর্থ হলো—বিতর্ক পরিহার করে আত্মমর্যাদা রক্ষা করা।
ইসলাম স্পষ্টভাবে অনর্থক তর্ক ও অসার বিতণ্ডাকে নিন্দা করেছে এবং এটিকে আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) অহেতুক ঝগড়া এড়িয়ে চলা ব্যক্তির জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তবে প্রয়োজন হলে সদ্ভাবে, প্রজ্ঞা ও শালীনতার সঙ্গে যুক্তিভিত্তিক আলোচনা করার অনুমতি দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত শান্তি, সামাজিক ঐক্য ও নৈতিক উৎকর্ষ বজায় রাখতে হলে আমাদের উচিত অহেতুক তর্ক পরিহার করে ধৈর্য, সহনশীলতা ও হিকমতের পথ অবলম্বন করা।
প্রফেসর ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


