ইসলাম অহংকারকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—তুমি পৃথিবীতে অহংকার করে চলাফেরা করো না। তুমি কখনো জমিন ভেদ করতে পারবে না, আবার পাহাড়ের সমান উচ্চতাও অর্জন করতে পারবে না (সুরা ইসরা: ৩৭)।

অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা জানান, মানুষ যা গোপনে রাখে আর যা প্রকাশ করে—সবই তিনি জানেন। আর তিনি অহংকারী মানুষকে একেবারেই পছন্দ করেন না (সুরা নাহল: ২৩)। একই সতর্কবার্তা এসেছে সুরা লোকমানে—মানুষের সঙ্গে অবজ্ঞাসূচক আচরণ কোরো না এবং অহংকারভরে পৃথিবীতে চলাফেরা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারীকে ভালোবাসেন না (লোকমান: ১৮)।
এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, দাম্ভিকতা ও অহংকার আল্লাহর দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ। মানুষকে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন—কেউ ধনী, কেউ গরিব; কেউ সাদা, কেউ কালো। এই পার্থক্যও তাঁরই ইচ্ছায়। আবার রিজিকের ব্যবস্থাও তিনি করে থাকেন। বাস্তবতা হলো, মানুষ কখনোই সম্পূর্ণ স্বনির্ভর নয়। জীবনের প্রতিটি ধাপে তাকে অন্যের সহায়তার মুখাপেক্ষী হতে হয়। তাই অহংকার মানুষের জন্য একেবারেই শোভন নয়।
অহংকারের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বহুবার সতর্ক করেছেন। হজরত হারিছা ইবনে ওহাব (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন—আমি কি তোমাদের জান্নাতিদের কথা বলব না? তারা সাধারণত দুর্বল ও সহজ-সরল মানুষ, যাদের সমাজ তুচ্ছ মনে করে। অথচ আল্লাহ তাদের এত ভালোবাসেন যে তারা কোনো বিষয়ে কসম করলে আল্লাহ তা বাস্তবায়ন করেন। এরপর তিনি জাহান্নামিদের কথা উল্লেখ করে বলেন—তারা হলো ঝগড়াটে ও অহংকারী স্বভাবের মানুষ (মুসলিম, মিশকাত)।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন—যার অন্তরে সামান্য পরিমাণ অহংকারও থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এক সাহাবি জানতে চাইলে, সুন্দর পোশাক বা জুতা পছন্দ করাও কি অহংকার? উত্তরে নবীজি (সা.) বলেন—আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন। প্রকৃত অহংকার হলো সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে হেয় মনে করা (মুসলিম)।
আরেক হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন—অহংকার আমার চাদর এবং বড়ত্ব আমার লুঙ্গি। যে কেউ এ দুটি গুণ নিজের জন্য দাবি করবে, তাকে আমি জাহান্নামে নিক্ষেপ করব (মুসলিম, মিশকাত)। অর্থাৎ অহংকার কেবল আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য।
কিয়ামতের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে রাসুল (সা.) বলেছেন, অহংকারীদের কিয়ামতের দিন পিঁপড়ার মতো ক্ষুদ্র করে একত্র করা হবে। মানুষরূপ থাকবে, কিন্তু অপমানে তারা চারদিক থেকে ঘিরে থাকবে। তাদের জাহান্নামের এক বিশেষ কারাগারে নিক্ষেপ করা হবে এবং সেখানে তাদের পান করানো হবে জাহান্নামিদের দেহ থেকে নিঃসৃত দুর্গন্ধযুক্ত রক্ত-পুঁজ (তিরমিজি)।
অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) তিনটি মুক্তিদানকারী ও তিনটি ধ্বংসকারী বিষয় উল্লেখ করেন। মুক্তিদানকারী বিষয়গুলো হলো—গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহভীতি, সব অবস্থায় সত্য বলা এবং ধনী-গরিব উভয় অবস্থায় সংযম অবলম্বন। আর ধ্বংসকারী বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—নফসের অনুসরণ, লোভ ও আত্মঅহংকার; যার মধ্যে অহংকার সবচেয়ে ভয়াবহ (শুয়াবুল ইমান)।
সবশেষে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, যার অন্তরে সামান্য পরিমাণ ইমান থাকবে, সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে না; কিন্তু যার অন্তরে সামান্য অহংকারও থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
অতএব, প্রত্যেক মুমিনের উচিত অহংকারমুক্ত অন্তর নিয়ে জীবন যাপন করা। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে অহংকারের ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করেন—এই কামনাই প্রত্যাশিত।
লেখক: এম এ মান্নান
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


