সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব নির্বাচন মানব সভ্যতার এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে নির্বাচিত নেতার সততা, যোগ্যতা ও ন্যায়পরায়ণতার ওপর। ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্ব কোনো মর্যাদা বা ক্ষমতার প্রতীক নয়; এটি একটি গুরুতর দায়িত্ব এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়। কোরআন ও হাদিসে নেতৃত্ব নির্বাচন ও দায়িত্ব গ্রহণের স্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে, যা আজকের জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক।

১. নেতৃত্ব একটি আমানত
ইসলামে নেতৃত্বকে একটি মহান আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানত তার যোগ্য ব্যক্তির কাছে অর্পণ করো এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করো, তখন ন্যায়বিচার করো।” (সুরা নিসা, আয়াত ৫৮)
অর্থাৎ, দায়িত্ব এমন ব্যক্তির হাতে দেওয়া উচিত, যিনি তা সঠিকভাবে পালনের যোগ্য। অযোগ্য বা দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে নেতৃত্ব দেওয়া কেবল সামাজিক ক্ষতি নয়, বরং এটি আমানতের খিয়ানত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সতর্ক করেছেন,
“যখন দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।” (বুখারি, হাদিস ৫৯)
২. যোগ্যতা ও সততা অপরিহার্য
ইসলামে নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুটি মূল গুণ অপরিহার্য— যোগ্যতা ও সততা। কোরআনে আল্লাহ বলেন,
“আমাকে দেশের ভাণ্ডারের দায়িত্ব দাও; নিশ্চয়ই আমি সংরক্ষণকারী ও জ্ঞানসম্পন্ন।” (সুরা ইউসুফ, আয়াত ৫৫)
মূসার উদাহরণে বলা হয়েছে, শক্তিশালী, বিশ্বস্ত ও যোগ্য ব্যক্তি মজুর নিযুক্ত করা উচিত। অর্থাৎ নেতৃত্বে দক্ষতা, সামর্থ্য এবং নৈতিকতা একসাথে থাকতে হবে।
৩. ক্ষমতার লোভ নিরুৎসাহিত
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“যারা নেতৃত্ব কামনা করে এবং এর প্রতি লোভী হয়, আমরা তাদেরকে এ দায়িত্ব দিই না।” (বুখারি, হাদিস ৭১৪৯)
নেতৃত্বের জন্য দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি; ক্ষমতার লোভ নয়।
৪. জনগণের দায়িত্ব ও সাক্ষ্য
ভোট প্রদানের সময় একজন নাগরিক মূলত সাক্ষ্য দেন যে, প্রার্থী নেতৃত্বের যোগ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও।” (সুরা নিসা, আয়াত ১৩৫)
দলীয় অন্ধভক্তি বা স্বার্থের কারণে অযোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া মিথ্যা সাক্ষ্যের সমান।
৫. পরামর্শভিত্তিক নেতৃত্ব
ইসলামে শূরা বা পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্ব রয়েছে।
“তাদের কাজ পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।” (সুরা শূরা, আয়াত ৩৮)
জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন ইসলামের ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইসলামের দৃষ্টিতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক কাজ নয়; এটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব। প্রার্থীর চরিত্র, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও জনকল্যাণে দক্ষতা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভুল নেতৃত্ব নির্বাচন সমাজে দুর্নীতি, অন্যায় ও অবিচারের পথ খুলে দিতে পারে।
সচেতন মুসলিমের জন্য নেতৃত্ব নির্বাচন মানে গভীর বিবেচনা, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এটি কেবল নাগরিক অধিকার নয়, বরং একটি আমানত এবং এমন একটি সিদ্ধান্ত, যার জন্য একদিন আল্লাহর সামনে জবাব দিতে হবে।
লেখক: মুফতি সাইফুল ইসলাম
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


