মানবজীবনের সবচেয়ে পবিত্র, নিঃস্বার্থ ও গভীর সম্পর্ক হলো মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক। একজন সন্তানের জন্ম থেকে তার লালন-পালন, শিক্ষা, আদর্শ গঠন ও জীবনের প্রতিটি ধাপে মা-বাবার সীমাহীন ত্যাগ ও ভালোবাসা জড়িয়ে থাকে। মা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন, আর বাবা কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রামের মাধ্যমে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। তাই ইসলাম মা-বাবার মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে এবং তাদের প্রতি সম্মান, আনুগত্য ও সদাচরণকে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করেছে।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই মা-বাবার সঙ্গে উত্তম আচরণের কথা উল্লেখ করেছেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-ও মা-বাবার সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাদের অসন্তুষ্টিকে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বর্তমান সময়ে অনেক মানুষ আত্মকেন্দ্রিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে মা-বাবার অধিকার ভুলে যাচ্ছে। তাই ইসলামের আলোকে সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জানা এবং তা বাস্তব জীবনে পালন করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ মা-বাবার সেবা ও দোয়া দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার অন্যতম মাধ্যম।
মহান আল্লাহ বলেন,
‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক কোরো না। আর মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’
— (সুরা নিসা, আয়াত : ৩৬)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘আমার প্রতি এবং তোমার মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। তোমাদের প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই।’
— (সুরা লুকমান, আয়াত : ১৪)
১. মা-বাবার সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলা
মা-বাবা সন্তানের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। তাই তাদের সঙ্গে সবসময় বিনয়ী ও ভদ্র আচরণ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন, তোমরা তাঁর ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করবে। তাদের কেউ বা উভয়েই যদি বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের প্রতি “উফ” শব্দটিও বলো না এবং ধমক দিয়ো না; বরং সম্মানের সঙ্গে কথা বলো।’
— (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৩)
২. অনুমতি ছাড়া কোথাও না যাওয়া
মা-বাবা সবসময় সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন। সন্তান বাইরে গেলে তারা উদ্বিগ্ন থাকেন। তাই কোথাও গেলে তাদের জানিয়ে ও অনুমতি নিয়ে যাওয়া সন্তানের দায়িত্ব। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার মা-বাবা জীবিত আছেন?’ লোকটি বলল, ‘হ্যাঁ।’ তখন তিনি বলেন, ‘তবে তাদের সেবার মাধ্যমেই জিহাদ করো।’
— (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩০০৪)
৩. রাগান্বিত হয়ে কথা না বলা
মা-বাবার সঙ্গে রাগ বা কঠোর ভাষায় কথা বলা উচিত নয়। এতে তারা কষ্ট পান। আর মা-বাবার কষ্টের দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘তিন ব্যক্তির দোয়া অবশ্যই কবুল হয়—মা-বাবার দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং মজলুমের দোয়া।’
— (তিরমিজি, হাদিস : ১৯০৫)
৪. তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা
মা-বাবার জীবদ্দশায় যেমন তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সম্মান করতে হবে, তেমনি মৃত্যুর পরও তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা সন্তানের দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘সর্বোত্তম সদাচরণ হলো, পিতার মৃত্যুর পর তার বন্ধুদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা।’
— (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৫২)
৫. মৃত্যুর পর তাদের জন্য দোয়া করা
মা-বাবার মৃত্যু হলেও সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাদের জন্য দোয়া করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। কোরআনে আল্লাহ তাআলা শিক্ষা দিয়েছেন,
‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে স্নেহ-মমতায় লালন-পালন করেছেন।’
— (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৪)
৬. তাদের নামে দান-সদকা করা
মা-বাবার মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে দান-সদকা করা অত্যন্ত ফজিলতের কাজ। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, ‘আমার মা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি, তিনি কি এর সওয়াব পাবেন?’ তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ।’
— (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩৮৮)
৭. কবর জিয়ারত করা
মা-বাবার মৃত্যুর পর তাদের কবর জিয়ারত করা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ মায়ের কবর জিয়ারত করেছিলেন। তিনি বলেছেন,
‘কবর জিয়ারত করো, কারণ তা মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’
— (আবু দাউদ, হাদিস : ৩২৩৪)
৮. মা-বাবাকে অপমানের কারণ না হওয়া
এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যার কারণে মা-বাবাকে অন্যের গালি বা অপমান সহ্য করতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘কবিরা গুনাহের অন্যতম হলো নিজের মা-বাবাকে গালি দেওয়া।’
— (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৭৩)
ইসলামে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন শুধু মানবিক কর্তব্য নয়, বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম পথ। তাদের সম্মান করা, ভরণ-পোষণ দেওয়া, বৃদ্ধ বয়সে সেবা করা, নম্র আচরণ করা এবং মৃত্যুর পর তাদের জন্য দোয়া ও সদকা করা একজন মুমিন সন্তানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
মা-বাবার সন্তুষ্টি পরিবারে শান্তি, সমাজে সৌহার্দ্য এবং জীবনে বরকত বয়ে আনে। একজন সন্তান যত বড়ই হোক না কেন, মা-বাবার ঋণ কখনো শোধ করতে পারে না। তাই আমাদের উচিত জীবিত অবস্থায় তাদের সর্বোচ্চ সম্মান ও সেবা করা এবং মৃত্যুর পরও তাদের জন্য নেক আমল ও দোয়া অব্যাহত রাখা। যে সন্তান মা-বাবার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে, সে দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সফলতা লাভ করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মা-বাবার হক আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


