ইসলামি হিজরি বর্ষের অষ্টম মাস হলো পবিত্র শাবান। রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এই মাসটি বাহ্যিকভাবে অনেকের কাছে সাধারণ মনে হলেও কোরআন-হাদিস ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমলের আলোকে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শাবান মূলত আত্মশুদ্ধি, আমল বৃদ্ধি এবং রমজানের জন্য মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির সময়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে এই মাস বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছে।

শাবান মাসের নামকরণ ও তাৎপর্য
‘শাবান’ শব্দটি আরবি ভাষা থেকে আগত, যার অর্থ হলো ছড়িয়ে পড়া বা বিভক্ত হওয়া। ইসলাম-পূর্ব যুগে এ মাসে আরবরা জীবিকা ও পানির সন্ধানে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ত। ইসলাম সেই ধ্যানধারণায় পরিবর্তন এনে শাবান মাসকে আখিরাতমুখী প্রস্তুতির সময় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.) বলেন, “শাবান এমন এক মাস, যাকে মানুষ অবহেলা করে, অথচ এটি আমল কবুলের গুরুত্বপূর্ণ সময়।”
শাবান মাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য
শাবান মাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এই মাসে বান্দার সারা বছরের আমল আল্লাহ তায়ালার দরবারে পেশ করা হয়। হজরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—“এটি এমন একটি মাস, যাকে মানুষ অবহেলা করে, অথচ এ মাসেই আমলসমূহ আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়।” (সুনানে নাসায়ি)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শাবান কেবল প্রস্তুতির মাস নয়, বরং আত্মসমালোচনা ও মূল্যায়নের সময়ও বটে।
শাবান মাসে রোজার গুরুত্ব
শাবান মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিক পরিমাণে নফল রোজা পালন করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, “রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।” (সহিহ মুসলিম)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি প্রায় পুরো শাবান মাসই রোজা রাখতেন। ইমাম নববী (রহ.) ব্যাখ্যা করে বলেন, এর অর্থ হলো—মাসের অধিকাংশ দিন তিনি নফল রোজা পালন করতেন।
শাবানে রোজার হিকমত
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই শাবানে বেশি রোজা রাখার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন—“আমি চাই, আমার আমল এমন অবস্থায় আল্লাহর দরবারে পেশ হোক, যখন আমি রোজাদার থাকি।” (সুনানে নাসায়ি)
এতে বোঝা যায়, রোজা আমল কবুলের সম্ভাবনা বাড়ায়, অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং রমজানের রোজার জন্য শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করে।
শাবান ও রমজানের পারস্পরিক সম্পর্ক
ওলামায়ে কেরাম শাবান মাসকে রমজানের পূর্বপ্রশিক্ষণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইমাম আবু বকর আল-বালখি (রহ.) বলেন—
“রজব হলো বীজ বপনের মাস, শাবান হলো পরিচর্যার মাস, আর রমজান হলো ফসল তোলার মাস।”
যে ব্যক্তি শাবান মাসে কোরআন তিলাওয়াত, রোজা ও নফল ইবাদতে অভ্যস্ত হয়, তার জন্য রমজান সহজ ও অধিক ফলপ্রসূ হয়।
শাবান মাসে দিন-রাতের ইবাদত
যদিও রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে নির্দিষ্ট কোনো ইবাদতের সময় নির্ধারণ করেননি, তবে তিনি এই মাসে তাহাজ্জুদ, নফল নামাজ, দীর্ঘ সিজদা ও কোরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি করতেন। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেন—
“তারা রাতের শেষ প্রহরে ক্ষমা প্রার্থনা করে।” (সুরা আয-যারিয়াত : ১৮)
শাবান মাসের রাতের ইবাদত অন্তরকে রমজানের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।
শবেবরাতের তাৎপর্য ও সীমা
শাবান মাসের মধ্যরাত (লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান) সম্পর্কে হাদিসে এসেছে—“এই রাতে আল্লাহ মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করেন।” (ইবনে মাজাহ)
আহলে সুন্নাহর মতে, এই রাতে ব্যক্তিগতভাবে নফল ইবাদত, তওবা ও ইস্তেগফার করা উত্তম। তবে নির্দিষ্ট পদ্ধতির নামাজ বা উৎসবমুখর আয়োজন শরিয়তসম্মত নয়।
শাবান মাসের সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা
শাবান মাস আমাদের শিক্ষা দেয়—হিংসা ও বিদ্বেষ পরিহার, তওবা, ক্ষমাশীলতা এবং সম্পর্ক পুনঃস্থাপন। বিশেষভাবে বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়—এটি শাবান মাসের অন্যতম বড় সতর্কতা।
পবিত্র শাবান মাস রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে ছিল নীরব সাধনার সময়। কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং গভীর আত্মগঠনের মাস। রোজা, ইবাদত, তওবা ও অন্তরের পরিশুদ্ধতাই ছিল এই মাসের মূল আমল। শাবানকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে রমজান হয়ে উঠবে আরও অর্থবহ ও কবুলিয়তের উপযোগী।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে শাবান মাসের সুন্নাহসমূহ অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মুফতি রফিকুল ইসলাম আল মাদানি
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


